যুক্তরাষ্ট্র-ইরান বৈঠক শুরু সুইজারল্যান্ডে, হরমুজ প্রণালি বন্ধের দাবি তেহরানের
ছবিঃ এলএবাংলাটাইমস
সুইজারল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সরাসরি নতুন দফার আলোচনা শুরু হতে যাচ্ছে। এর মধ্যেই ইরান দাবি করেছে যে, দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি হামলার প্রতিবাদে তারা আবারও কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী এই দাবি অস্বীকার করে জানিয়েছে, প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে।
রোববার সকালে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স সুইজারল্যান্ডে পৌঁছান। পরে দিনেই আলোচনার নতুন পর্ব শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। অন্যদিকে শনিবার রাতে ইরানের প্রতিনিধি দল, যার মধ্যে পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি রয়েছেন, সুইজারল্যান্ডে পৌঁছান।
এই আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের পাশাপাশি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ এবং দেশটির সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরও অংশ নিচ্ছেন। চলমান সংঘাতের সময় পাকিস্তান মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করেছে এবং এর আগেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে এক দফা আলোচনা আয়োজন করেছিল।
বৈঠকের আগে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানায়, “ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে হওয়া সমঝোতা বাস্তবায়নে পাকিস্তান সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে।”
সুইজারল্যান্ড যাত্রার আগে জেডি ভ্যান্স সাংবাদিকদের বলেন, তিনি পারমাণবিক ইস্যু এবং লেবানন যুদ্ধবিরতি নিয়ে অগ্রগতি আশা করছেন। তিনি আরও বলেন, “পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে এবং উত্তেজনা কিছুটা কমছে। আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে ইসরায়েল ও লেবানন—উভয়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং পুরো অঞ্চলকে স্থিতিশীল রাখা।”
অন্যদিকে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেছেন, “আমরা চাই অন্য পক্ষ তাদের প্রতিশ্রুতি পূরণ করুক।”
এর আগে চলতি সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রেসিডেন্টরা একটি প্রাথমিক চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন, যার লক্ষ্য ছিল অবিলম্বে যুদ্ধ বন্ধ করা এবং আগামী ৬০ দিনের মধ্যে একটি চূড়ান্ত সমঝোতায় পৌঁছানো।
তবে পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে লেবাননে ইসরায়েল ও ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর চলমান সংঘর্ষ। শনিবার লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ইসরায়েলি বিমান হামলায় অন্তত ৪৭ জন নিহত হয়েছেন।
ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) দাবি করেছে, তারা হিজবুল্লাহর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ৮০টি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে এবং সংগঠনটির “ডজনখানেক” সদস্যকে হত্যা করেছে। একই সঙ্গে আইডিএফ জানিয়েছে, তাদের চারজন সেনাও নিহত হয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তি ঘোষণার পরও ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে গোলাগুলি অব্যাহত ছিল। তবে শুক্রবার দুই পক্ষের মধ্যে তাৎক্ষণিক যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়।
হিজবুল্লাহ অভিযোগ করেছে, লেবাননে ইসরায়েলের হামলা বৃহত্তর যুক্তরাষ্ট্র-ইরান শান্তি চুক্তিকে নস্যাৎ করার চেষ্টা। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রও লেবাননে ইসরায়েলের চলমান সামরিক অভিযান নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত ২ মার্চ থেকে পুনরায় শুরু হওয়া সংঘাতে এখন পর্যন্ত ৪,০৫৭ জন নিহত হয়েছেন।
এদিকে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) দাবি করেছে, লেবাননে ইসরায়েলি হামলা যুদ্ধবিরতির শর্ত লঙ্ঘন করেছে। সেই কারণেই হরমুজ প্রণালি পুনরায় বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
ইরানের সামরিক বাহিনীর অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্রও তাদের মধ্যে স্বাক্ষরিত ১৪ দফা সমঝোতা স্মারকের প্রথম ধারা বাস্তবায়ন করেনি। ওই ধারায় সব ফ্রন্টে, বিশেষ করে লেবাননে, সামরিক অভিযান অবিলম্বে ও স্থায়ীভাবে বন্ধ করার কথা বলা হয়েছিল।
তবে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম)-এর মুখপাত্র টিম হকিন্স বলেছেন, “হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল অব্যাহত রয়েছে।” তিনি আরও বলেন, “ইরান হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ করে না, এবং পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে মার্কিন বাহিনী সতর্ক রয়েছে।”
সেন্টকম জানিয়েছে, শনিবার হরমুজ প্রণালি দিয়ে ৫৫টি বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল করেছে, যেগুলো বিশ্ববাজারে ১ কোটি ৭০ লাখ ব্যারেলের বেশি তেল বহন করছিল।
তবে জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী বিভিন্ন তথ্য অনুযায়ী, কয়েকটি তেলবাহী ট্যাংকার প্রণালি অতিক্রম করলেও কিছু জাহাজকে এলাকায় ঘুরে যেতে দেখা গেছে।
উল্লেখ্য, বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ব্যারেল তেল ও তেলজাত পণ্য পরিবহন করা হয়। মার্কিন জ্বালানি তথ্য প্রশাসনের হিসাব অনুযায়ী, এর মাধ্যমে বছরে প্রায় ৬০০ বিলিয়ন ডলারের জ্বালানি বাণিজ্য সম্পন্ন হয়।
এলএবাংলাটাইমস/ওএম
নিজস্ব প্রতিবেদক
শেয়ার করুন