আপডেট :

        মেডিকেইড জালিয়াতির অভিযোগের মুখে বিষয় ঘোরাতে চাইছে ক্যালিফোর্নিয়া

        ফোন ধরতে বাধ্য করা হচ্ছে সুবিধা প্রক্রিয়াকরণে নিয়োজিত কর্মীদের, বাড়ছে সোশ্যাল সিকিউরিটির জট

        ৭৫ দেশের নাগরিকদের জন্য ইমিগ্র্যান্ট ভিসা ইস্যু স্থগিত করল মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর

        ৭৫ দেশের অভিবাসী ভিসা স্থগিত: ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে ফেডারেল মামলা

        FY ২০২৭ সালের H-1B ভিসার প্রাথমিক নিবন্ধন শুরু ৪ মার্চ

        সপ্তাহান্তে ক্যালিফোর্নিয়ায় স্বাভাবিকের চেয়ে ২০ ডিগ্রি পর্যন্ত বেশি তাপমাত্রার সম্ভাবনা

        লস এঞ্জেলেস ও অরেঞ্জ কাউন্টিতে আরও একটি হাম রোগী শনাক্ত

        কক্ষপথে ১০ লাখ স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের আবেদন স্পেসএক্সের

        মিনিয়াপোলিসে আইসিই কর্তৃক আটক পাঁচ বছরের শিশুকে মুক্তির নির্দেশ বিচারকের

        ক্যালিফোর্নিয়ায় বাড়ি কেনাবেচা প্রায় দুই দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন

        ভাড়া নিয়ন্ত্রণ ভেঙে ১ কোটি ৮০ লাখ ডলার লাভের অভিযোগে মামলা

        হাউজিং ট্র্যাকার: দাবানলের আগে ডিসেম্বরে দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ার আবাসন বাজারে ধীরগতি

        মার্কিন অভিবাসী ভিসা স্থগিতাদেশ সরাতে ৭৫ কংগ্রেসম্যানের চিঠি

        গ্রাহকসেবায় ৫ মিনিটের বেশি অপেক্ষা নয়: ক্যালিফোর্নিয়ায় নতুন বিল, মানবিক যোগাযোগ নিশ্চিতের উদ্যোগ

        লস এঞ্জেলেসের দাবানল-পরবর্তী পুনর্গঠন অনুমতির নিয়ন্ত্রণ নিতে নির্বাহী আদেশে স্বাক্ষর ট্রাম্পের

        মিনিয়াপোলিসে গুলিকাণ্ডের পর ফেডারেল এজেন্টদের বিরুদ্ধে মামলা সহজ করতে বিল পাস করল ক্যালিফোর্নিয়া সিনেট

        ট্রাম্প নীতির প্রভাবে বিদেশি জনসংখ্যা কমল ১৫ লাখ, হুমকিতে ক্যালিফোর্নিয়ার অর্থনীতি

        ক্যালিফোর্নিয়ায় ২ লাখ ৬০ হাজার ডলারে বাড়ি! কোথায় মিলছে সবচেয়ে সস্তা বাড়ি?

        ম্যাজিক জনসনের উদ্যোগে লস এঞ্জেলেস বন্দরে নতুন ক্রুজ টার্মিনাল

        মিনিয়াপলিসে অ্যালেক্স প্রেটি হত্যাকাণ্ড: তদন্তের দাবিতে রিপাবলিকানদের চাপ বাড়ছে

বাঙালি জাতির গৌরবদীপ্ত সূচক

বাঙালি জাতির গৌরবদীপ্ত সূচক

গণিতশাস্ত্রের উৎপত্তির পর থেকে একুশ একটি সংখ্যা। কিন্তু বাঙালির ভাষা আন্দোলন সেই সংখ্যাকে বাঙালি জাতির জীবনে একটি প্রত্যয় হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। এটি আমাদের জীবনে সাধারণ কোনো সংখ্যা বা তারিখ নয়। এ সংখ্যাটির আগে ‘অমর’ যুক্ত করে আমরা আমাদের জাতিসত্তার ইতিহাসের সঙ্গে একুশের চেতনাকে একীভূত করেছি। তাই অমর একুশের চেতনা বাঙালি জাতির গৌরবদীপ্ত সূচক।

আমরা আমাদের এই দীপশিখাকে চির অম্লান রেখে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে বহন করে চলেছি। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে একুশ এমন একটি গভীর সত্য, যা আমাদের সঠিক পথে পরিচালিত করে। আমাদের ইতিহাস নির্মাণে ভুল হয় না। বায়ান্ন থেকে শুরু করে আমরা যে কোনো গভীর সংকটে-সংগ্রামে যথাযথ দায়িত্ব পালন করে এ সত্য প্রমাণ করেছি। সুতরাং একুশের চেতনা আমাদের জীবনে অবিনাশী আয়োজন। একুশকে কেন্দ্র করে যে বইমেলা উদ্যাপিত হয়, তা আমাদের সাংস্কৃতিক নির্মাণকে গতিদান করে। একুশের প্রতিভূ শহিদ মিনার আমাদের রাজনৈতিক দিকনির্দেশনার তীর্থভূমি।

আমরা প্রয়োজনে শহিদ মিনারে গিয়ে শপথ গ্রহণ করি। আজকের জঙ্গি উত্থানের পটভূমিতে একুশের চেতনাই আমাদের প্রতিরোধের হাতিয়ার। এভাবেই যতদিন বাঙালি জাতি থাকবে, বাংলাদেশ থাকবে, শহিদ মিনার থাকবে এবং মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার সমুন্নত থাকবে-ততদিন একুশের চেতনাও আমাদের জাতিসত্তার বুকের গভীরে থাকবে। এ দেশ থেকে নির্মূল হবে জঙ্গিবাদ।

বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের সাতচল্লিশ বছর পর অমর একুশের দিনটি ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসাবে ইউনেস্কো কর্তৃক স্বীকৃত হয়েছে। ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর এমন একটি ঘোষণার দিন। প্রশ্ন হলো, পরবর্তী বছরগুলোয় আমরা কি তেমন কিছু অর্জন করতে পেরেছি? এ বছর ভাষা আন্দোলনের একাত্তর বছর পূর্ণ হলো। মার্চে স্বাধীনতার ৫২ বছর পূর্ণ হয়েছে। এটি কোনো ক্ষুদ্র সময় নয়। মহাকালের হিসাবে ক্ষুদ্র সময় হলেও একটি জাতির জীবনে দীর্ঘ সময়। এ সময়ে আমরা যতটা কথা বলেছি, ততটা কাজ করিনি। জীবনের সর্বক্ষেত্র নির্মাণের জায়গাগুলো আমরা তৈরি করতে ব্যর্থ হয়েছি। বলা যায় প্রবলভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা, সেই সঙ্গে বাংলা ভাষাও, যে ভাষার মর্যাদার জন্য আমাদের জীবন দান।

সংবিধানে বলা হয়েছে, ‘প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রভাষা বাংলা’। কিন্তু সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থার সর্বস্তরে বাংলা ভাষা স্বীয় মর্যাদায় আসীন এ কথা বলা যাবে না। পরিস্থিতি এমন যে, সর্বগ্রাসী বাণিজ্যিক মানসিকতা মাতৃভাষাকে প্রান্তিক করে ফেলেছে। দেশের অধিকাংশ মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত পরিবারের ছেলেমেয়েরা ইংরেজি মাধ্যমে পড়াশোনা করে। তারা না দেয় মাতৃভাষার মর্যাদা, না বোঝে আত্মমর্যাদার ধারণা। হীনম্মন্য মানসিকতার তোড়ে ভেসে যায় তাদের শিকড়হীন জীবনের বিলাসিতা।

ইংরেজি আন্তর্জাতিক ভাষা। এই ভাষা শেখা নিয়ে কারোই এখন দ্বিমত নেই। জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চা এবং আন্তর্জাতিক যোগাযোগের জন্য ইংরেজি জানা প্রয়োজন। আমার প্রশ্ন : এই ইংরেজি জানার জন্য মাতৃভাষার অবমাননা হতে দেওয়া উচিত কি?

বেশ কিছুদিন আগে একজনকে বলেছিলাম, মেয়েকে ইংরেজি মাধ্যমে পড়াচ্ছ, ঠিক আছে; কিন্তু মেয়েটি ওর মাতৃভাষা জানবে না কেন? তুমি যে ওকে ওর মাতৃভাষা শেখা থেকে বঞ্চিত করছ, তাতে ওর মানবাধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে না? তুমি কি ওকে ওর আইডেনটিটি বোঝার চেতনা থেকে বিচ্ছিন্ন করছ না? যাকে কথাগুলো বলেছিলাম সে চুপ করে ছিল। মুক্তিযুদ্ধে জীবন দেওয়া শহিদ পরিবারের এই প্রজন্মের শিশুরা স্বাধীন বাংলাদেশে এভাবে বড় হচ্ছে। আমি তাকে আরও বলেছিলাম, এই বাংলাদেশের জন্য কি তোমরা যুদ্ধ করেছিলে? সে চুপ করেই ছিল।

স্বাধীনতার বায়ান্ন বছর পর দেখেশুনে মনে হয়, গ্রামের নিরন্ন সাধারণ মানুষই নিজ মাতৃভাষাকে অবমাননা না করেই জনজীবনের শক্তি হিসাবে ধরে রেখেছে। সিডরে ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে ত্রাণ বিতরণের সময় দেখেছিলাম, একজন নারী তার স্বামীকে দেওয়া কার্ডটি নিয়ে এসেছে। নির্দিষ্ট দিন ত্রাণ বিতরণের আগে বেশি ক্ষতিগ্রস্তদের শনাক্ত করে কার্ড দেওয়া হয়েছিল। সেই নারীকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, কার কার্ড নিয়ে এসেছেন? এ কার্ডে তো আপনার নাম নেই? তিনি অবলীলায় বলেছিলেন, মোর গেরস্তের। অসুখ। আইতে পারে নাই।

গেরস্ত শব্দটি শুনে চমকে তার দিকে তাকাই। বুঝতে পারি তিনি প্রমিত বাংলার শব্দ স্বামী বাতিল করে দিয়ে তার নিজের ভাষায় উত্তর দিয়েছেন। ওই আঞ্চলিক শব্দটি তার মাতৃভাষা। আমি শহর থেকে গেছি। আমার সঙ্গে ভাষা গুছিয়ে বলতে হবে, এই বিশ্বাসই তার নেই। প্রমিত বাংলা ভাষা তার রাষ্ট্র তাকে শেখার সুযোগ করে দেয়নি। তাই বলে তার মাতৃভাষা নিয়ে তার কোনো দ্বিধা বা সংকোচ নেই।

দেখা যাক, ভাষা আন্দোলনের শহিদদের পরিচয় এবং তার সঙ্গে সামাজিক ভাবনার জায়গা। যারা শহিদ হয়েছেন তাদের মধ্যে একমাত্র বরকত ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। রফিক ছিলেন প্রেসের কর্মচারী, সালাম সচিবালয়ের পিওন, জব্বার কৃষক, অহিউল্লাহ কাঠমিস্ত্রির ছেলে এবং শফিউর রহমান হাইকোর্টের কর্মচারী।

ভাষার জন্য যারা প্রাণ দিয়েছিলেন, তারা প্রত্যেকে ছিলেন বিভিন্ন জেলার আঞ্চলিক ভাষার মানুষ। বেশির ভাগই ছিলেন সাধারণ মানুষ। তাদের পরিবারের পরবর্তী প্রজন্ম শিক্ষা নিয়ে বাণিজ্য করেনি, মাতৃভাষার অমর্যাদা করেনি। বরং ভাষার পক্ষে প্রবল জনশক্তি হয়ে টিকে আছে। প্রয়োজনে আবার জীবন দেবে।

ফেব্রুয়ারি এলে এসব কথা লিখব আর আক্ষেপ করব-এই নিয়তিই কি আমার প্রজন্মের এবং আগামী প্রজন্মের? নাকি এমন দিন দ্রুত ঘনিয়ে আসবে যখন মাতৃভাষার জন্য কেউ আফসোস করবে না? নাকি বাংলা ভাষার ইতিহাস রক্ষা করার জন্য আবার জীবন দিতে হবে?

ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ একটি প্রত্যয়দীপ্ত সময়। তারপরও স্বাধীন দেশে ভাষার মর্যাদা নিয়ে প্রশ্ন কেন? এখনই সময় নিজেদের অবস্থান খতিয়ে দেখার। শিক্ষাব্যবস্থা থেকে শুরু করে জনজীবনের সর্বত্র মাতৃভাষাকে সমুন্নত করার।

সেলিনা হোসেন : কথাসাহিত্যিক; সভাপতি, বাংলা একাডেমি



এলএবাংলাটাইমস/আইটিএলএস

শেয়ার করুন

পাঠকের মতামত