আপডেট :

        মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন কর্মকর্তাদের লক্ষ্যবস্তু করতে ইরানের তৎপরতা বেড়েছে, গোয়েন্দা প্রধানের সতর্কবার্তায় বাড়ছে উদ্বেগ

        অ্যাপলের প্রথম ফোল্ডেবল আইফোন কিনতে লস এঞ্জেলেসে রাতভর অপেক্ষা, দাম প্রায় দুই হাজার ডলার

        মৌসুমের শুরুতেই ফ্লুতে দুইজনের মৃত্যু, টিকাদানে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে বলছে লস এঞ্জেলেস কাউন্টি

        ক্যালিফোর্নিয়ার ছয়টি অমীমাংসিত খুনের রহস্য সমাধানে ৩ লাখ ডলার পুরস্কার ঘোষণা নিউজমের

        ছয় সপ্তাহ বন্ধ থাকার পর ফিরল ডিজনিল্যান্ডের ইন্ডিয়ানা জোন্স রাইড, কী কী পরিবর্তন হলো এবার

        ক্যালিফোর্নিয়ার উপকূলে বাড়ছে জলোচ্ছ্বাসের ঝুঁকি, বালুর বাঁধ নির্মাণে রাতদিন কাজ করছেন কর্মীরা

        আর্কাডিয়ায় ১৫ বছরের কিশোরীকে হত্যার পর নিজেকেও গুলি করলেন সাবেক প্রেমিক, জানাল পুলিশ

        মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে জ্বালানির দাম কমাতে ভারতীয় তেল শোধনাগারের দ্বারস্থ ট্রাম্প প্রশাসন

        মিসিসিপিতে ওয়ালমার্টের পার্কিংয়ে পুলিশের গুলিতে এক বছরের শিশুর মৃত্যু, প্রকাশ পেল বডিক্যামের ভিডিও

        আলাস্কার সিনেট নির্বাচনে রিপাবলিকান হারলে ফল ঘোষণা আটকে দিতে আদালতের দ্বারস্থ ট্রাম্প প্রশাসন

        ফোনে প্রেসক্রিপশনের কথা বলে হুমকি, ভুয়া পুলিশ পরিচয়ে ক্যালিফোর্নিয়ায় প্রতারণার সতর্কতা

        ঝড়বৃষ্টির পর দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ায় ফিরছে শুষ্ক ও উষ্ণ আবহাওয়া, সপ্তাহান্তে বাড়বে তাপমাত্রা

        নতুন স্টেশন চালুর কয়েক মাসেই রক্ষণাবেক্ষণের কাজ, বন্ধ হচ্ছে লস এঞ্জেলেসের তিনটি মেট্রো স্টেশন

        ধনীদের সম্পদে কর বসানোর প্রস্তাব ঠেকাতে লাখো ডলার ব্যয়, সম্পদের তুলনায় খরচ সামান্য

        যুক্তরাষ্ট্রে মুসলিমদের দেশপ্রেম নিয়ে প্রশ্ন কেন, সিনেট নির্বাচনে আলোচনায় আবদুল এল-সায়েদ

        কম ভাড়ার আশায় যেসব অ্যাপার্টমেন্টে থাকেন মানুষ, সেগুলোই এখন বড় ঝুঁকির মুখে

        ১৬০ বছরের ঐতিহ্যে ইতি টানছে নিউইয়র্ক, নিরাপত্তা ও প্রাণী নির্যাতনের উদ্বেগে ঘোড়ার গাড়ি নিষিদ্ধ

        টপ গান ও এলিয়েন তারকা টম স্কেরিটের মৃত্যু, হলিউডে নেমে এসেছে শোকের ছায়া

        দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ায় ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস, লস এঞ্জেলেসে বন্যার ঝুঁকি বাড়ছে

        ক্লাসরুমে বন্দুক নিয়ে শিক্ষার্থী, ক্যালিফোর্নিয়ার স্কুলে পুলিশের ব্যাপক অভিযান

কক্সবাজারে পর্যটকদের নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা

কক্সবাজারে পর্যটকদের নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা

পৃথিবীর দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত কক্সবাজারের নয়নজুড়ানো দৃশ্য দেশী-বিদেশী পর্যটকদের কাছে টানে। উঁচু পাহাড়, নৈসর্গিক বনভূমি, বিস্তৃত বালুকারাশি ও উচ্ছল ফেনিল ঊর্মিমালা দেখতে লাখ লাখ ভ্রমণপিয়াসী পর্যটক কক্সবাজারে ভিড় করেন। কক্সবাজার থেকে টেকনাফগামী ৮৪ কিলোমিটার বিস্তৃত পিচঢালা মেরিন ড্রাইভের একপাশে লতাগুল্ম আচ্ছাদিত পাহাড়, অন্য দিকে সমুদ্রের নীল জলরাশি পর্যটকদের বিমোহিত না করে পারে না। শীত মৌসুমে টানা কয়েক দিন সরকারি বন্ধ পেলে হোটেলে জায়গা না পেয়ে পথেঘাটে রাত যাপন করলেও পর্যটকদের বিনোদনে ভাটা পড়ে না। এরই মধ্যে কক্সবাজারের লাবণী পয়েন্ট, কলাতলী, সুগন্ধা পয়েন্ট, হিমছড়ি ও ইনানিতে গড়ে উঠেছে আন্তর্জাতিকমানের বহুতল আবাসিক হোটেল, মোটেল, কটেজ ও মনোমুগ্ধকর রেস্তোরাঁ। বাংলাদেশের মানুষের পরিভ্রমণের প্রথম পছন্দের স্থান হলো কক্সবাজার। ঢাকা থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত রয়েছে বিভিন্ন কোম্পানির স্লিপার ও লাক্সারি এসি বাস। এ ছাড়া তিনটি বিমান সংস্থা প্রায় বিশটি ফ্লাইট পরিচালনা করে এক দিনে। কক্সবাজার বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার কাজ চলছে পুরোদমে।
সমুদ্রসৈকত ছাড়াও কক্সবাজারে ঘুরে ফিরে দেখার মতো আকর্ষণীয় পর্যটন স্পট রয়েছে আরো। ইনানির পাথুরে বিচ, হিমছড়ির পাহাড়ি ঝরনা, প্রবালদ্বীপসমৃদ্ধ সেন্টমার্টিন, মহেশখালীর আদিনাথ মন্দির, মাতারবাড়ির কয়লাবিদ্যুৎ প্রকল্প, কুতুবদিয়ার হজরত মালেক শাহ কুতুবির মাজার, সোনাদিয়া দ্বীপ, ডুলাহাজারা সাফারি পার্ক, রামুর বৌদ্ধমন্দির ও স্থাপনা প্রভৃতি পর্যটকদের মুগ্ধ করে।
কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতকে ঘিরে নিদ্রি যে নিরাপত্তা বলয় তৈরি হওয়ার কথা তা এখনো গড়ে ওঠেনি। দলবদ্ধভাবে নারীধর্ষণ, হয়রানি, ছিনতাই, ইভটিজিং, অবিশ্বাস্য মূল্যে খাবার বিক্রি, চার গুণ বেশি দামে হোটেলের ভাড়া হাঁকা নৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে সেখানে। ট্যুরিস্ট পুলিশ, স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও জেলা প্রশাসনের ভূমিকা যে নেই তা নয়। মাঝে মধ্যে অভিযানও পরিচালিত হয় এবং ধর পাকড়ও হয়। তবে তা ক্রমবর্ধমান চাহিদার চেয়ে নিতান্ত অপ্রতুল। সম্প্রতি জেলা প্রশাসন নারী ও শিশুদের জন্য ৬০০ ফুট দীর্ঘ একটি নিরাপদ জোন তৈরি করেছে। এটা ভালো উদ্যোগ। কিন্তু ১১৬ কিলোমিটার সৈকত এলাকা অরক্ষিত রেখে কেবল স্বল্প পরিসরের একটি ‘নিরাপদ জোন’ তৈরি করলে পর্যটকদের আস্থা তৈরি করা যাবে বলে মনে হয় না। কিছু সন্ত্রাসীর বিরুদ্ধে ১৫-২০টি মামলা থাকা সত্ত্বেও কী করে তারা সৈকত এলাকায় ঘুরে বেড়ায়, মাদক কারবারি চালায়, চাঁদাবাজি করে এবং সুযোগ বুঝে দলবদ্ধভাবে নারীধর্ষণের ঔদ্ধত্য দেখায়? এসব প্রশ্ন পর্যটনশিল্প সংশ্লিষ্টদের। এসব দুর্ঘটনায় দেশী-বিদেশী পর্যটকদের কাছে বিরাট ভুল বার্তা যাচ্ছে। মানুষ এখন স্ত্রী ও ছেলেমেয়েদের নিয়ে কক্সবাজার ঘুরতে যেতে ভয় পাচ্ছেন। এমনকি সোশ্যাল মিডিয়ায় কক্সবাজার বয়কটের দাবি তুলেছেন অনেক অ্যাক্টিভিস্ট। এর আগেও বেশ ক’জন বিদেশী নারী পর্যটক ধর্ষণ ও হেনস্তার শিকার হয়ে সফর সংক্ষিপ্ত করে দেশে ফিরে গেছেন।
পর্যটকদের আধিক্য এবং সঙ্কটের অজুহাত দেখিয়ে চা-নাশতা-খাবারের দাম ও হোটেলের কক্ষ ভাড়া তিন থেকে চার গুণ বেশি নেয়া প্রসঙ্গে হোটেল ও রেস্তোরাঁ মালিকদের সমিতির সমন্বিত মোর্চা ‘ফেডারেশন অব ট্যুরিজম ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ’-এর সাধারণ সম্পাদক আবুল কাশেম সিকদার বলেন, ‘এরকম কিছু অভিযোগ আমাদের কাছেও আসে, আসছে। যেসব হোটেল-রেস্তোরাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ, সেগুলোর কোনোটাই নিবন্ধিত নয়। সৈকত এলাকার হোটেল-মোটেল জোনের ভেতরে ছয় থেকে ১২ তলাবিশিষ্ট ৪৩টির বেশি ফ্ল্যাটবাড়ি আছে, যা আবাসিক আদলে নির্মিত। ফ্ল্যাটগুলো দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের লোকজনের কাছে বিক্রি করা হয়। পর্যটন মৌসুমে স্থানীয় ও বাইরের কিছু লোক ফ্ল্যাটবাড়িগুলো ভাড়া নিয়ে ব্যবসা করছেন। তারা এক হাজার টাকার একটি কক্ষের ভাড়া সাত থেকে ১০ হাজার টাকা নেন। শুল্ক বিভাগের খাতায় ফ্ল্যাটবাড়িগুলোর নাম আছে কি না, সন্দেহ। গাড়ি থেকে নামলেই দালালের খপ্পরে পড়েন পর্যটকরা। দালালরা নানা প্রলোভন দিয়ে পর্যটকদের ওই সব ফ্ল্যাটবাড়িতে নিয়ে যান। টমটম ও রিকশাচালকরা ফ্ল্যাটবাড়িতে পর্যটক নিয়ে যান কমিশনের ভিত্তিতে। পর্যটনশিল্পের জন্য এটি অশনিসঙ্কেত’ (প্রথম আলো, ২৫ ডিসেম্বর ২০২১)। এমন অভিযোগ গুরুতর। তদন্তের মাধ্যমে অভিযুক্তদের যথাযথ শাস্তির আওতায় আনা না গেলে কক্সবাজার তার ঐতিহ্য হারাবে।
স্থানীয় প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষ পর্যটকের জন্য ২০ বছরেও জাল দিয়ে সমুদ্রের কিছু অংশ ঘিরে নিরাপদ গোসলের ব্যবস্থা করতে পারেননি। প্রতি বছর সমুদ্র গোসল করতে নেমে পর্যটকরা ঢেউয়ের আঘাতে তলিয়ে যাচ্ছেন। মৃতদের মধ্যে বেশির ভাগই শিক্ষার্থী। জরুরি ভিত্তিতে এ ব্যাপারে পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন। নিরাপত্তা ও সুযোগ-সুবিধার ঘাটতি দীর্ঘ দিন অব্যাহত থাকলে পর্যটকরা মুখ ফিরিয়ে নেবেন এবং অন্যান্য দেশের ট্যুরিস্ট স্পটে চলে যাবেন।
স্মর্তব্য, সারা পৃথিবীতে পর্যটনশিল্প জাতীয় আয়ের এক বিরাট উৎস। সরকারি কর্তৃপক্ষ ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরা বসিয়ে, সিভিল ড্রেসে বা ইউনিফর্মধারী পুলিশের মাধ্যমে পুরো সৈকত এলাকা নিয়ন্ত্রণ করে থাকেন। থাইল্যান্ডের পাতায়া, ইন্দোনেশিয়ার বালি, মালয়েশিয়ার লঙ্কাভি, সাবা ও সারাওয়াক, আমিরাতের কোর্নিশে গভীর রাতে ও অতি প্রত্যুষেও পর্যটকদের নির্বিঘেœ ঘুরতে দেখা যায়। এসব এলাকার জনগণ ও ব্যবসায়ীরা পর্যটকবান্ধব। এসব দেশে ত্রিসীমানার মধ্যে সন্ত্রাসী ও ধান্ধাবাজদের টিকিটি খুঁজে পাওয়া রীতিমতো দুষ্কর। ব্যবসায়ীরা পণ্য বিক্রি করার পর গ্রাহককে তাদের ঐতিহ্য অনুযায়ী সম্ভাষণ জানাতেও কসুর করেন না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের চেয়ারম্যান ড. সন্তোষ কুমার দেব মনে করেন, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা-২০৩০ অর্জন এবং করোনা-পরবর্তী অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে বিশ্বজুড়ে যে পাঁচটি সেক্টরকে চিহ্নিত করা হয়েছে তন্মধ্যে অভ্যন্তরীণ পর্যটন উল্লেখযোগ্য। কক্সবাজারে হোটেল, মোটেল, গেস্টহাউজ, কটেজ ও রেস্তোরাঁয় কর্মরত আছেন প্রায় ৪০ হাজার কর্মচারী যার আয় দিয়ে চলে তাদের পরিবার। এরই মধ্যে অভ্যন্তরীণ পর্যটন বেশ জমজমাট, যার ফলে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার মান বৃদ্ধি পাচ্ছে। যখনই কক্সবাজার জমতে শুরু করেছে পর্যটন তখনই বাদ সেধেছে নানাবিধ সমস্যা; যার ফলে পর্যটক সংখ্যা কমে যাচ্ছে এবং এর প্রভাব পড়বে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর আয়, কর্মসংস্থান ও জীবনযাত্রার মানে (ঢাকা পোস্ট ডট কম/মতামত/৮৭০৪৫)
সরকার ইচ্ছা করলে কক্সবাজার সুগন্ধা পয়েন্ট থেকে টেকনাফ পর্যন্ত পর্যটন এলাকার সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তার দায়িত্ব আন্তর্জাতিক বা দেশীয় কোনো নামী-দামি প্রতিষ্ঠানকে দিতে পারে। শাপলাপুর থেকে কলাতলী পর্যন্ত কয়েকটি জোনে ভাগ করতে পারে। এতে সরকারের রাজস্ব বৃদ্ধি পাবে। বৈদেশিক মুদ্রা আসবে। দিন দিন কক্সবাজারে পর্যটকদের ভিড় বাড়ছে। এটা ধরে রাখতে হবে এবং আন্তর্জাতিক পর্যটকদের চাহিদা পূরণের ব্যবস্থা করতে হবে। ২০২১ সালের নভেম্বর-ডিসেম্বরে তিন-চার লাখ পর্যটক কক্সবাজারে বেড়াতে আসেন। মাত্র এক লাখ ৬০ হাজার ধারণক্ষমতাসম্পন্ন ৪৬৯টি হোটেল-মোটেল, গেস্ট হাউজ রয়েছে সেখানে। পর্যটন মৌসুমে চাহিদা মেটানোর জন্য সমুদ্রের কোলঘেঁষে আরো আবাসিক হোটেল গড়ে তোলার সুযোগ আছে। কক্সবাজারের মানুষ ঐতিহ্যগতভাবে বন্ধুবৎসল ও অতিথিপরায়ণ। কিছু মুনাফালোভী ও দুর্বৃত্তের কারণে অপার সম্ভাবনার কক্সবাজারের পর্যটন শিল্পের সুনাম নষ্ট হতে দেয়া যাবে না।


লেখক : অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ও গবেষক

শেয়ার করুন

পাঠকের মতামত