মেডিকেইড জালিয়াতির অভিযোগের মুখে বিষয় ঘোরাতে চাইছে ক্যালিফোর্নিয়া
শিক্ষানবিশ এএসপিদের কুচকাওয়াজ স্থগিত, কারণ কী?
রাজশাহীর সারদায় শিক্ষানবিশ সহকারী পুলিশ সুপারদের (এএসপি) প্রশিক্ষণ সমাপনী কুচকাওয়াজ হঠাৎ স্থগিতের ঘটনা নানা আলোচনার জন্ম দিয়েছে। কারো বিরুদ্ধে কোনা নির্দিষ্ট অভিযোগ ছাড়াই শুধু একটি ফেসবুক পোস্টের কারণে পুরো ব্যাচের কুচকাওয়াজ স্থগিতের ঘটনাকে 'নজিরবিহীন' বলছেন কেউ কেউ।
গতকাল রোববার (২০ অক্টোবর) রাজশাহীর পুলিশ একাডেমিতে এ কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু হঠাৎ করেই স্থগিত হয়ে যায় সেই কুচকাওয়াজ।
পুলিশ সদর দপ্তর কুচকাওয়াজ স্থগিত হওয়ার বিস্তারিত কোন কারণ উল্লেখ করেনি। বাহিনীর মুখপাত্র শুধু বলেছেন ‘অনিবার্য কারণে’ এটি স্থগিত করা হয়েছে। যদিও এই কুচকাওয়াজে যোগ দেওয়ার জন্য স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টাসহ পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা রাজশাহীতে পৌঁছেছিলেন।
এরই মধ্যে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমন্বয়ক সালাউদ্দীন আম্মার শিক্ষানবিশ সহকারী পুলিশ সুপারদের ৬২জনকে ‘ছাত্রলীগের ক্যাডার’ উল্লেখ করে ওই অনুষ্ঠানে যোগদানের আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যানের বিষয়টি সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট দিয়ে জানালে এ নিয়ে আলোচনা শুরু হয়।
মূলত এ কারণেই শনিবার রাতে অনেকটা তাড়াহুড়ো করেই আজকের কুচকাওয়াজটি স্থগিত ঘোষণা করা হয় বলে অনেকে মনে করেন। যদিও দুটি বিষয়ের মধ্যে আদৌ যোগসূত্র আছে কী-না কর্তৃপক্ষের তরফ থেকে তা কেউ নিশ্চিত করেনি।
যেভাবে বিতর্কের সূচনা
সরকারি কর্মকমিশন বা পিএসসি ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে ৪০ তম বিসিএস পরীক্ষা বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছিল। এরপর প্রিলিমিনারি, লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষাসহ যাচাই বাছাইয়ের সব ধাপ শেষে ২০২২ সালের নভেম্বরে নির্বাচিত প্রার্থীদের গেজেট প্রকাশ করে সরকার।
ওই গেজেট অনুযায়ী তখন ৭১ জনের সহকারী পুলিশ সুপার পদে যোগদানের কথা, যাদের মধ্যে ৬২ জন দুই বছরের প্রশিক্ষণ শেষে রোববার পুলিশ একাডেমির প্যারেড গ্রাউন্ডে সমাপনী কুচকাওয়াজে অংশ নেওয়ার কথা ছিল।
এদিকে দুইদিনের সফরে রাজশাহীতে থাকা স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার এই কুচকাওয়াজে প্রধান অতিথি যোগ দেওয়ার কথা ছিল। পুলিশের অন্য কর্মকর্তারাও শনিবারের মধ্যেই রাজশাহীর সারদা পুলিশে একাডেমিতে পৌঁছে যান।
এর মধ্যেই শনিবার রাতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক সালাউদ্দীন আম্মার ফেসবুকে একটি পোস্ট দেন। পুলিশ একাডেমির আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করে পোস্টে তিনি লিখেন, কোনো রকম তদন্ত ছাড়াই আওয়ামী লীগের দোসরদের এএসপি পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। আমাদের ভাইদের মৃত্যুর মিছিল এখনও চলছে। এ অবস্থায় এই দোসরদের নিয়োগ ও প্রশিক্ষণ দেওয়া মানে শহীদদের রক্তের সঙ্গে বেইমানি করা।
ফেসবুকে তার এমন স্ট্যাটাসের পর স্থগিত হয়ে যায় কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠান। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়, অনিবার্য কারণে সমাপনী কুচকাওয়াজ স্থগিত করা হয়েছে।
কুচকাওয়াজ স্থগিতের পরে ফেসবুকে আরেক পোস্টে আম্মার লিখেন, প্রোগ্রাম ক্যান্সেল করেছে পুলিশ একাডেমি সারদা। কিছুদিন ধরে চলা অনুষ্ঠান, স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা গতকাল থেকেই রাজশাহীতে থাকার পরও মাত্র জানাল ক্যান্সেল করা হয়েছে। কিছু বুঝলেন? আওয়ামী ফ্যাসিস্টদের আমরা কখনো গ্রহণ করব না। তদন্ত হোক পরে যোগ্য ব্যক্তি নিয়োগ পাক।
'নজিরবিহীন' ঘটনা
সারদায় পুলিশ একাডেমিতে প্রশিক্ষণার্থী সহকারী পুলিশ সুপারদের পুরো ব্যাচ জুড়ে কুচকাওয়াজ স্থগিতের ঘটনা অনেকটাই 'নজিরবিহীন' বলছেন পুলিশের সাবেক কর্মকর্তাদের কয়েকজন।
পুলিশের সাবেক আইজিপি নূরুল হুদা বলেছেন, এটি আইন বহির্ভূত না হলেও একটু অস্বাভাবিক ও কিছুটা নজিরবিহীন।
তিনি বলেন, কিছু কিছু ব্যাচের লম্বা সময় ধরে প্রশিক্ষণে রাখার ঘটনা আগেও হয়েছে অনেক সময়। কিংবা প্রশিক্ষণ চলাকালে বিভিন্ন যৌক্তিক কারণে অনেকে বাদ পড়েছেন চাকরি থেকে। কিন্তু পুরো ব্যাচের কুচকাওয়াজ স্থগিতের ঘটনা সম্ভবত নজিরবিহীন ও একটু অস্বাভাবিক।
নূরুল হুদা বলছেন, প্রশিক্ষণ কালে কারও আচরণ যথাযথ না হলে তাকে সরাসরি বাদ দেওয়ার এখতিয়ারও কর্তৃপক্ষের আছে। এছাড়া, আবেদনের সময় যেসব তথ্য প্রার্থী দিয়ে থাকে, সেগুলোর কোনটি অসত্য প্রমাণিত হলেও ব্যবস্থা নেওয়া যায়।
সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, বিভিন্ন সময়ে প্রশিক্ষণ শেষ করেও কুচকাওয়াজে যোগ দেয়ার অনুমতি না পাওয়ার উদহারণও পুলিশ বাহিনীতে আছে।
সারদায় ট্রেনিং সম্পন্ন করেও বিএনপি সরকারের আমলে চূড়ান্ত কুচকাওয়াজ বা পাসিং আউটে যোগদান করতে পারেননি অন্তত এক ডজন কর্মকর্তা। এর মধ্যে আলোচিত পুলিশ কর্মকর্তা হারুন অর রশীদও ছিলেন। পরে আওয়ামী লীগ আমলে ওই কর্মকর্তারা আবার চাকরিতে পুনর্বহাল হয়েছিলেন।
আবার, আওয়ামী লীগ আমলে বিভিন্ন সময়ে পাঁচশর বেশি এসআই পদমর্যাদার কর্মকর্তা চাকরি হারিয়েছিলেন।
তাদের বিভিন্ন প্রতিবাদ কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌস।
তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ আমলে দলীয়করণ হয়েছে-এটা সত্যি। তাই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উচিত ছিল এই কুচকাওয়াজের আগেই এগুলো পর্যালোচনা করে দেখা। সেটি না করে, তারা ফেসবুক স্ট্যাটাস দেখে সিদ্ধান্ত নিল, যা তাদের নতজানু আচরণ ও সক্ষমতার অভাবকেই তুলে ধরেছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মুজিবুর রহমান বলেছেন, আগেও বিভিন্ন সময় প্রার্থীর কিংবা তার আত্মীয় স্বজনের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা দেখিয়ে অনেককে চাকরিতে চূড়ান্ত নিয়োগ থেকে বঞ্চিত বা চাকরিচ্যুত করা হয়েছিল। এখনো সেই ধারা চলমান থাকলে তা হবে দুঃখজনক।
তিনি বলেন, কেউ যদি রাজনৈতিক পরিচয়ের সুবাদে পরীক্ষায় সুবিধা পেয়ে চাকুরী পেয়ে থাকেন, প্রমাণসাপেক্ষে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে যৌক্তিক। কিন্তু সবাইকে রাজনৈতিক তকমা দিয়ে চাকরিতে যোগদান থেকে বঞ্চিত করাটা সঠিক হবে না।
এলএবাংলাটাইমস/আইটিএলএস
নিউজ ডেক্স
শেয়ার করুন