মেডিকেইড জালিয়াতির অভিযোগের মুখে বিষয় ঘোরাতে চাইছে ক্যালিফোর্নিয়া
চড়া দরে দিশেহারা কৃষক, বাড়ছে উৎপাদন খরচ
দশ বিঘা জমিতে চাষাবাদ ছিল আশরাফ আলীর। এর মধ্যে সাত বিঘা বিলীন হয়েছে ব্রহ্মপুত্র নদে। অবশিষ্ট জমি চাষাবাদ করে স্ত্রী ও দুই ছেলেকে নিয়ে ভালোই চলছিল তাঁর দিন। হঠাৎ কৃষি উপকরণের দাম বাড়ায় চাপে পড়েন।
আশরাফ আলীর ভাষ্য, জমি চাষ করে সংসার চলে তাদের। আমন মৌসুমে আবাদ করে সারা বছর চলার মতো ধান উৎপাদন করেন। কিন্তু কৃষি উপকরণের চড়া দরে দিশেহারা তারা। বাজারে বীজধানের দাম বেশি। যাদের বীজতলা নেই, তারা চড়া দরে রোপা আমনের বীজ কিনে রোপণ করছেন। বর্তমানে রোপা আমন বীজের দাম বেড়েছে। সারের দাম বেশি। বেড়েছে ডিজেলের দামও। চড়া মূল্যের বাজারে চাষাবাদ করে তেমন লাভের দেখা মেলে না। যা আসে, তা দিয়ে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়ছে।
আশরাফ আলীর বাড়ি দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার পোল্যাকান্দি নামাপাড়ায়। তাঁর মতো অবস্থা অন্য কৃষক পরিবারগুলোর। কৃষি উপকরণের দাম বাড়ায় দিশেহারা হয়ে পড়েছেন তারা।
বাহাদুরাবাদ নাজিরপুর গ্রামের চাষি আব্দুর রউফ জানান, আগে রোপা আমন চাষে বিঘাপ্রতি খরচ হতো চার থেকে পাঁচ হাজার টাকা। বর্তমানে ব্যয় হচ্ছে আট থেকে দশ হাজার টাকা।
কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, দেওয়ানগঞ্জে ৫২ হাজার ৮৬১ কৃষক পরিবার রয়েছে। এ অঞ্চলের প্রধান ফসল ধান, পাট, ভুট্টা ও আখ। বেশির ভাগ চাষির খাদ্যের জোগান আসে ধান চাষে। চলতি রোপা আমন মৌসুমে ৯ হাজার ৫৩৫ হেক্টর জমিতে আমন চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে প্রতিষ্ঠানটি। ইতোমধ্যে ৪ হাজার ৯৮০ হেক্টর জমিতে রোপা আমনের চারা রোপণ করা হয়েছে। বাকি জমিতে সেপ্টেম্বরের প্রথম পক্ষের মধ্যে রোপণ শেষ হবে বলে আশা করছে কৃষি বিভাগ।
জানা গেছে, গত বছর রোপা আমন মৌসুমে শ্রমিকপ্রতি মজুরি ছিল ৫৫০ থেকে ৬০০ টাকা। বর্তমানে তা ৭০০ টাকা। গত বছর বীজতলায় চারা উৎপাদনের শুরুর দিকে প্রতি কেজি ধানবীজের মূল্য ছিল ৪৪০ টাকা। কিন্তু চলতি বছর তা বিক্রি হয়েছে ৪৭০ থেকে ৫৮০ টাকায়। গত বছর প্রতি বিঘা রোপা আমনের চারার মূল্য ছিল ১ হাজার ৫০০ টাকা। চলতি বছর তা ৫০০ টাকা বেড়েছে।
সরকার নির্ধারিত সারের মূল্য ইউরিয়া প্রতি বস্তা ১ হাজার ৩৫০ টাকা, মিউরিয়েট অব পটাশ ১ হাজার, ডিএপি ১ হাজার ৫০ ও টিএসপি ১ হাজার ৩৫০ টাকা। এর মধ্যে ইউরিয়া সরকার নির্ধারিত মূল্যে খুচরা ও পাইকারি বাজারে বিক্রি হচ্ছে। বর্তমান বাজারে টিএসপি সারের জোগান নেই। কিন্তু মিউরিয়েট অব পটাশ (এমওপি) খুচরা বাজারে ১ হাজার ৩২০ এবং ডিএপি ১ হাজার ৩২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এ উপজেলায় ২১ জন বিসিআইসির সার ডিলার রয়েছে। সরেজমিন দেখা যায়, বিসিআইসির সার ডিলাররা সরকার নির্ধারিত মূল্যে সার বিক্রি করছেন। কিন্তু প্রত্যন্ত অঞ্চলের খুচরা ব্যবসায়ীরা এমওপি ও ডিএপি সারের কৃত্রিম সংকট দেখিয়ে বেশি দরে বিক্রি করছেন। এ ব্যাপারে উপজেলা কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, তারা নিয়মিত সারের বাজার মনিটরিং করছেন।
চাষিরা জানান, চালসহ অন্যান্য নিত্যপণ্যের মূল্য বৃদ্ধি পেলেও বাড়েনি ধানের দাম। গত বছর এই মৌসুমে বাজারে প্রতি মণ ধান বেচাকেনা হতো ১ হাজার ২৫০ থেকে ১ হাজার ৩৫০ টাকায়। চলতি বছর তা অপরিবর্তিত রয়েছে। এ অঞ্চলে এক বিঘা জমিতে ১০ থেকে ১৫ মণ রোপা আমন ধান ফলে। প্রতি মণ ধান ১ হাজার ৩০০ টাকায় বেচাকেনা হলে গড় উৎপাদন সাড়ে ১২ মণ ধানের মূল্য দাঁড়ায় ১৬ হাজার ২৫০ টাকা। এক বিঘা জমিতে ধান চাষে ব্যয় হয় ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা। সে হিসেবে রোপা আমন চাষ করে একজন কৃষক নিট মুনাফা পাচ্ছেন পাঁচ থেকে ছয় হাজার টাকা। এর মধ্যে রয়েছে নিজের শ্রমের মজুরি।
বর্ষা মৌসুম শেষে রোপা আমন চাষ হয়, এতে বন্যার ঝুঁকি থাকে। বেশির ভাগ সময়ই কৃষকের রোপা আমন বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
চার বিঘা জমিতে আমন চাষ করেছেন পাথরের চরের আব্দুল জব্বার। তাতে আগে মোট ব্যয় হতো ২০ হাজার টাকা। এ বছর তিন বিঘা জমিতে রোপা আমন চাষে ব্যয় হয়েছে ২১ হাজার টাকা।
বাঘারচর সরকার পাড়া গ্রামের কৃষক রবিউল ইসলামের ভাষ্য, তিন বিঘা জমিতে আমন চাষ করেছেন তিনি। অন্যান্য বছরের তুলনায় অনেক বেশি ব্যয় হয়েছে। সামনে বন্যার ভয়। এ অঞ্চলের জমি নিচু। অল্প বন্যায় পানি ওঠে। শেষ পর্যন্ত আমন ধান ঘরে তুলতে পারবেন কিনা অনিশ্চিত।
কৃষি কর্মকর্তা রতন মিয়া বলেন, দেওয়ানগঞ্জে রোপা আমনের লক্ষ্যমাত্রা ৯ হাজার ৫৩৫ হেক্টর। ইতোমধ্যে ৫ হাজার হেক্টর জমিতে চারা রোপণ করা হয়েছে। কোনো ব্যবসায়ী যেন সারের কৃত্রিম সংকট তৈরি বা নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দরে বিক্রি না করেন, সে ব্যাপারে সজাগ উপজেলা কৃষি বিভাগ।
এলএবাংলাটাইমস/আইটিএলএস
নিউজ ডেক্স
শেয়ার করুন