আপডেট :

        মিনিয়াপোলিসে গুলিকাণ্ডের পর ফেডারেল এজেন্টদের বিরুদ্ধে মামলা সহজ করতে বিল পাস করল ক্যালিফোর্নিয়া সিনেট

        ট্রাম্প নীতির প্রভাবে বিদেশি জনসংখ্যা কমল ১৫ লাখ, হুমকিতে ক্যালিফোর্নিয়ার অর্থনীতি

        ক্যালিফোর্নিয়ায় ২ লাখ ৬০ হাজার ডলারে বাড়ি! কোথায় মিলছে সবচেয়ে সস্তা বাড়ি?

        ম্যাজিক জনসনের উদ্যোগে লস এঞ্জেলেস বন্দরে নতুন ক্রুজ টার্মিনাল

        মিনিয়াপলিসে অ্যালেক্স প্রেটি হত্যাকাণ্ড: তদন্তের দাবিতে রিপাবলিকানদের চাপ বাড়ছে

        ফুলারটনে বিদ্যালয়ের কাছে অস্ত্রধারী সন্দেহভাজন: সতর্কতা না পাওয়ায় প্রশ্নে অভিভাবক ও বাসিন্দারা

        মিনেসোটায় আইসিই অভিযানে হত্যাকাণ্ড: ডেমোক্র্যাটদের বিদ্রোহে আবারও যুক্তরাষ্ট্রে সরকার শাটডাউনের শঙ্কা

        মিনিয়াপোলিসে আলেক্স প্রেটির হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে বিক্ষোভ, উত্তাল লস এঞ্জেলেস

        মিনিয়াপোলিসে আলেক্স প্রেটির হত্যাকাণ্ড: তদন্তের দাবি ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান উভয় দলের

        ক্যালিফোর্নিয়ায় ৭ বিলিয়ন ডলারের জালিয়াতির দাবি ভাইস প্রেসিডেন্ট ভ্যান্সের, মিনেসোটাকেও ছাড়িয়ে গেছে পরিমাণ

        লস এঞ্জেলেসে সড়ক দুর্ঘটনায় ২৯০ মৃত্যুর প্রতিবাদে সিটি হলের সামনে ব্যতিক্রমী ‘ডাই-ইন’ বিক্ষোভ

        মিনিয়াপোলিসে ফের এক মার্কিন নাগরিকের গুলিতে মৃত্যু, বিক্ষোভ আবারও জারি

        যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যাহারের পর ডব্লিউএইচওর রোগ পর্যবেক্ষণ নেটওয়ার্কে যোগ দিল ক্যালিফোর্নিয়া

        লস এঞ্জেলেসে গৃহহীন তহবিল আত্মসাৎ: দাতব্য সংস্থার প্রধান গ্রেপ্তার

        ক্যালিফোর্নিয়ায় বাড়ির দামে মৃদু পতন: ৮৮% এলাকায় মূল্য কমেছে

        বিচারকের পরোয়ানা ছাড়াই বাড়িতে ঢোকার নির্দেশ আইসিইকে—ফাঁস মেমো

        ক্যালিফোর্নিয়ায় ফেডারেল অভিযানে গুলি, ব্যাপক নিরাপত্তা তৎপরতা

        প্রথম প্রজন্মের গৃহক্রেতাদের জন্য ক্যালিফোর্নিয়ার ডাউন পেমেন্ট সহায়তা কর্মসূচি আবার চালু

        ট্রাম্পের কাছে ‘নতি স্বীকার’ না করতে বিশ্বনেতাদের কড়া বার্তা নিউজমের

        ২০২৫ সালের শেষে ক্যালিফোর্নিয়ায় বাড়ির দাম কমেছে, বিক্রি বেড়েছে

আইয়ুব খান ভিক্ষা করে শেখ মুজিবের বাড়ি!

আইয়ুব খান ভিক্ষা করে শেখ মুজিবের বাড়ি!

তখন আমার বয়স কত ছিল তা আমি বলতে পারব না। মাকে জিজ্ঞাসা করেছি বহুবার। তিনিও বলতে পারেননি। আমাদের বংশের মুরব্বি ৮০ বছর বয়স্কা ফুফুকেও জিজ্ঞাসা করলাম। তার সোজাসাপ্টা উত্তর- জানি না। ফলে অনেকটা অনুমানের ওপর ভিত্তি করেই সময়টা সম্পর্কে আমার অভিজ্ঞান বর্ণনা করতে হচ্ছে। আমি হয়তো তখন বালক ছিলাম। তা না হলে দফাদার সাহেবদের মিছিল মিটিং কিংবা স্লোগানের শব্দমালা আমার মনের মধ্যে আজও গেঁথে আছে কেন? আমাদের গ্রামসহ আশপাশের দশ গ্রামের মধ্যে দফাদার ছিলেন প্রধানতম সম্মানিত ও প্রভাবশালী ব্যক্তি। চকিদারের মর্যাদাও কম ছিল না। তবে দফাদারের মতো অতটা নয়। এ পদ-পদবির সম্মান ও মর্যাদা প্রতিভূরূপে গ্রামের সচ্ছল পরিবারের নাদুসনুদুস শান্তশিষ্ট, পরিমল প্রকৃতির বালকদের লোকজন আদর করে দফাদার সাব বলত। দফাদার সাবরা ৮-১০ বছর বয়স পর্যন্ত নেংটু থাকত। শীতকাল কিংবা কোনো আনন্দ-উৎসব পূজা পার্বণ বা ভিন গ্রামে বেড়াতে গেলে তাদের পোশাক-আশাক পরানো হতো। অন্যথায় তাদের জন্মকালীন জাতীয় পোশাকেই তাদের গর্বিত পিতা-মাতা, আত্মীয়-স্বজন ও পাড়া-প্রতিবেশীরা অবলোকন করতে আনন্দ অনুভব করতেন।
আমাদের গ্রামে প্রায় শ'খানেক দফাদার ছিল। তারা দুই-তিনটি দলে ভাগ হয়ে সকাল-বিকাল খেলাধুলা করত আবার মাঝে মধ্যে দস্যুপনাতেও যোগ দিত। তারা উলঙ্গ থাকলেও তাদের প্রায় সবার কোমরে থাকত তাগা। এক ধরনের কালো রঙের বেশ মোটা সুতার রশিকে তাগা বলা হতো। তাগার সঙ্গে বাঁধা থাকত অনেকগুলো তাবিজ, দুই-তিনটা ঘণ্টা এবং আরও কিসব জিনিসপত্র। তাদের গলায় থাকত একই ধরনের সুতা দিয়ে তৈরি মালা। তাতে রুদ্রাক্ষ, কড়ি, তামা, লোহা, সিসা প্রভৃতির টুকরা ঝুলান থাকত। অনেকের হাতে বাঁধা থাকত বাহারি আকৃতির তাবিজ। মুরব্বিরা তাদের দফাদারদের ভূত-প্রেত, জাদু-টোনা, সাপ এবং মানুষের বদ নজর থেকে বাঁচানোর জন্য এত্তসব আয়োজন করত। যমদূত বা রোগবালাই যাতে তাদের আক্রমণ না করে এ জন্য নিকৃষ্টসব নামে দফাদারদের ডাকা হতো। যেমন- ফালু, ফেলনা, পচা, বিল্লু ইত্যাদি। 
আমি যে সময়টার কথা বলছি তখন বোধ হয় আইয়ুব শাহীর শেষ জমানা। বাংলার পথে-প্রান্তরে, আনাচে-কানাচে আইয়ুববিরোধী জনমত প্রবল হয়ে উঠেছিল। নিভৃত পল্লীর দরিদ্র গৃহবধূ থেকে শুরু করে শহরের কুলবধূ কিংবা বনের কাঠুরিয়া থেকে শুরু করে জেলে, চামার, মুচি, কামার-কুমার প্রভৃতি শ্রেণির মানুষের হৃদয়ে পাকিস্তানি হুকুমত, আইয়ুব খান এবং তার সাঙ্গপাঙ্গদের জুলুমের খবর পৌঁছে গিয়েছিল। আর তাই আমাদের গ্রামের সোনামণি দফাদাররা রোজ বিকালে এমন স্লোগান তুলে মিছিল করতে পেরেছিল। তারা স্লোগান তুলত এবং সুর করে বলত- 'ইলশা মাছের বিল্সা কাঁটা, বোয়াল মাছের দাড়ি! আইয়ুব খান ভিক্ষা করে শেখ মুজিবের বাড়ি'।
আইয়ুব খানের পতন হয়েছিল ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের কারণে। তিনি ২৫ মার্চ ১৯৬৯ সালে পদত্যাগ করেন। কাজেই আমি যে সময়ের কথা বললাম তা হয়তো ১৯৬৮ সালের শেষ দিক বা ১৯৬৯ সালের প্রথম দিকের ঘটনা হবে। আজ পরিণত বয়সে এ কথা বুঝতে আমার একটুও কষ্ট হয় না যে, সমগ্র বাংলাদেশ অর্থাৎ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান আইয়ুব খান এবং তার স্বৈরাচারী সামরিক শাসনকে প্রত্যাখ্যান করেছিল। বাঙালি তাদের প্রাণপুরুষ শেখ মুজিবুর রহমানকে হৃদয়ের মণিকোঠায় স্থান দিয়ে মন ও মননশীলতায় মুজিবীয় আদর্শ ধারণ করতে শিখেছিল। আর তাই তো ছোট ছোট বালকের মুখে ফুটে উঠেছিল মুজিবের জয়গান। সেই গানের প্রচণ্ড ঝঙ্কারে আইয়ুব খান নিঃস্ব হতে হতে ভিক্ষুকে পরিণত হয়েছিলেন আর মুজিব পরিণত হয়েছিলেন ভিক্ষাদানকারী মহান এবং সক্ষম মহামানবে।
আজ বিজয়ের মাসে আমার শৈশবের সেসব কাহিনী মনে পড়ল ভিন্ন একটি কারণে। মুক্তিযুদ্ধের সময়কার কিছু ঘটনা এবং ৭০-এর দশকের কিছু প্রেক্ষাপট যদি বর্তমান সময়ে অর্থাৎ ২০১৪ সালে এসে মেলাতে চাই তখন সব কিছু কেমন যেন এলোমেলো হয়ে যায়- ঠিক মেলে না বা মেলাতে পারি না। কেন মেলে না সে কথাগুলোই আজ বলব। যে দফাদাররা আইয়ুব খানকে ফকির বানাল এবং শেখ সাহেবকে আমির বানাল ঠিক তারাই কিন্তু ভিন্ন স্লোগান তুলল ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধকালীন। তারা বলত- 'দাড়ি ফেলাইয়া রাখছে মোচ, তারে বলে মুক্তিফৌজ! মোচ ফেলাইয়া রাখছে দাড়ি, তারে বলে মিলিটারি।' এ স্লোগানের মানে কি? অজপাড়া গাঁয়ে মুক্তিযুদ্ধকালীন এ স্লোগান কারা ছড়িয়ে দিল এবং তাদের উদ্দেশ্যই বা কি? স্লোগানের ভাষা শুনলে স্পষ্ট বোঝা যায় যে, মুসলমানদের ধর্মীয় অনুভূতি, তাহজিব এবং তমদ্দুনকে ব্যবহার করে মুক্তিবাহিনীর বিরুদ্ধে ধর্মহীনতার অভিযোগ তোলা হয়েছে। তারা দাড়ি অর্থাৎ নবীর সুন্নতকে ফেলে দিয়েছে এবং নবী যা নিষেধ করেছেন তা করেছে অর্থাৎ মোচ রেখেছে। ইসলামের বিধান মতো মোচ ভেজানো পানি খাওয়া হারাম। অন্যদিকে মিলিটারি সম্পর্কে ধর্মপ্রাণ মুসলমান আবেগ, অনুভূতি এবং বিশ্বাসকে পুঁজি করে প্রচারণা চালানো হয়েছিল যে, তারা নিষিদ্ধ মোচ ফেলে দিয়ে নবীর সুন্নত দাড়ি রেখেছে।
অনেকে হয়তো বলতে পারেন, আপনাদের এলাকায় রাজাকার বেশি ছিল বিধায় আপনারা এমনটি শুনেছেন। কই আমাদেরও তো ছেলেবেলা ছিল। আমরা তো এমন আজগুবি স্লোগান ফ্লোগান শুনিনি। এই মতাদর্শের লোকদের বলছি- আমার বাড়ি ফরিদপুর জেলার সদরপুর উপজেলায়। বৃহত্তর ফরিদপুর জেলা সেই সুলতানী আমল অর্থাৎ মোগল আমলের বহু আগে থেকেই রাজনীতি, অর্থনীতি, সাহিত্য-সংস্কৃতি, ধর্মাচার এবং আরও অনেক কিছুর সূতিকাগার ছিল। ব্রিটিশ আমল, পাকিস্তানি আমল এমনকি স্বাধীন বাংলাদেশে এই জেলার গুরুত্বকে দেশের অন্য কোনো অঞ্চল অতিক্রম করতে পারেনি। সময়ের প্রয়োজনে এই জেলার মানুষ সচেতনভাবেই মূল ধারার রাজনীতির সঙ্গে ছিল। ষাটের দশকে জেলার বেশির ভাগ মানুষ আওয়ামী লীগ করত। আর সদরপুরে তো আওয়ামী লীগ ছাড়া অন্য কোনো দলই ছিল না। রাজাকার ফাজাকার আমরা কোনোকালে দেখিওনি এবং শুনিওনি। তাহলে প্রকৃত ঘটনা কি ছিল?
কিছুদিন আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন বেশ ক্ষোভের সঙ্গেই বললেন যে, বঙ্গবন্ধু একটি অনিচ্ছুক জাতিকে তড়িঘড়ি করে স্বাধীনতা উপহার দিয়ে গেছেন। ফলে বেশির ভাগ লোকই স্বাধীনতার মর্যাদা বুঝতে সক্ষম নয়। আমি তার মতামতের সঙ্গে আরও একটু যোগ করে বলতে চাই- যে প্রত্যয় নিয়ে এ দেশের রাজনৈতিক নেতারা দেশবাসীকে ভাষা আন্দোলন, ৬ দফার আন্দোলন, আইয়ুববিরোধী আন্দোলন এবং ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান সম্পর্কে সজাগ, সচেতন এবং একীভূত করতে পেরেছিলেন সেভাবে মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে দেশবাসীকে ঐক্যবদ্ধ করতে পারেননি। কেউ কেউ মাত্রাতিরিক্ত উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখিয়ে বঙ্গবন্ধুকে আগেভাগে স্বাধীনতা ঘোষণার জন্য চাপ দিয়ে শেষমেশ নিজেরা কোথায় যে পালিয়ে গেলেন তা আজ অবধি কেউ জানে না। আমি নিজেও জানি না সেসব নেতার মুক্তিযুদ্ধকালীন কর্মকাণ্ড সম্পর্কে যারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সর্ব প্রথম স্বাধীন বাংলার পতাকা উড়িয়েছিলেন। আমার খুব জানতে ইচ্ছা করে ওইসব নেতা কোন রণাঙ্গনে যুদ্ধ করেছেন? তারা কয়জন রাজাকার বা পাকিস্তানি সৈন্য মেরেছেন! তারা কি কোনো বাহিনীর নেতৃত্বে ছিলেন নাকি কোনো বাহিনীর অন্তর্ভুক্ত যোদ্ধা হিসেবে যুদ্ধ করেছেন? তারা কি যুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ অবদানের জন্য কোনো খেতাব পেয়েছেন নাকি কলকাতাকেন্দ্রিক মুক্তিযোদ্ধা সংগঠক ছিলেন।
এত বছর পর এসব প্রশ্ন নতুন করে মনে জাগছে এ কারণে যে, স্বাধীনতার পর পর কেন ছাত্রলীগের একটি বিরাট অংশ বঙ্গবন্ধু সরকারের বিরুদ্ধে সরাসরি গেরিলা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। মেজর জলিল, কর্নেল তাহের, সিরাজ সিকদারের বিদ্রোহ সম্পর্কে সঠিক তথ্য দেশবাসীকে জানানো না হলে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের গৌরব নিয়ে অনেকের মনে সন্দেহ থেকে যাবে। অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে চুলচেরা বিশ্লেষণ করতে হবে মুক্তিযুদ্ধকালীন মানুষের মন-মানসিকতা এবং ধ্যানধারণা সম্পর্কে। কেন এ দেশের মানুষের একাংশ গত ৪৩ বছর ধরে ১৯৭১ সালকে গণ্ডগোলের বছর বলছে। মুক্তিযুদ্ধের বছর তো গণ্ডগোল হতে পারে না। সাধারণত নিজেদের মধ্যকার অন্তর্দ্বন্দ্ব, অনাসৃষ্টি এবং কলহ-বিবাদকে বুঝতে গণ্ডগোল শব্দটি ব্যবহৃত হয়। মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষ শক্তির বহুমুখী অন্তর্দ্বন্দ্ব, সংঘাত এবং কলহ আজ আর গোপন কোনো বিষয় নয়। যারা বঙ্গবন্ধুকে আগেভাগে স্বাধীনতার ঘোষণা প্রদানের জন্য তীব্র চাপ প্রয়োগ করত এবং যারা অতি আগ্রহ দেখিয়ে আগেভাগে পতাকা উড়িয়ে আওয়ামী লীগ, বঙ্গবন্ধু এবং দেশের মুক্তিকামী সাধারণ মানুষকে বন্দুকের নলের সামনে ঠেলে দিয়েছিলেন তাদের যদি প্রশ্ন করা হয় স্বাধীনতা যুদ্ধের জন্য আপনাদের কি কি সামরিক প্রস্তুতি ছিল? কি কি অর্থনৈতিক, কূটনৈতিক প্রস্তুতি ছিল কিংবা ব্যাকবোন হিসেবে সরবরাহ লাইনে বা পাইপলাইনে যুদ্ধের রসদের কোনো ব্যবস্থা ছিল কি?
আমি জানি তারা উত্তর দিতে পারবেন না। তাদের যদি পৃথিবীর একডজন মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বলতে বলা হয় কিংবা পৃথিবীর গুরুত্বপূর্ণ ৫-৬ যুদ্ধের প্রেক্ষাপট, পটভূমি এবং ফলাফল বিশ্লেষণ করতে বলা হয় সে ক্ষেত্রে তারা আরও লজ্জাজনক পরিস্থিতিতে পড়বেন। গলাভারি করে গম গম আওয়াজ তুলে কোনো নেতাকে অনুসরণ করা কিংবা নেতার কাঁধে চড়ে নেতার রক্ত-মাংস খাওয়া যত সহজ বাস্তবজীবনে আলুভর্তা করাও যে কঠিন তা এ দেশের অনেক রাজনৈতিক নেতাই প্রমাণ করেছেন।
পৃথিবীর ইতিহাসের আদিকাল থেকে আজ অবধি কোনো যুদ্ধই হঠাৎ করে বাধেনি। শারীরিক-মানসিক, অর্থনৈতিক-সামাজিক এবং নৈতিক দিক থেকে ব্যাপক প্রস্তুতি ছাড়া কোনো যুদ্ধে জয়লাভ করা যায় না। হঠাৎ করে যদি কেউ আক্রমণ করে বসে তখন তাকে বলা হয় হামলা- যুদ্ধ নয়। যুদ্ধের প্রতিপক্ষ থাকতে হবে। ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি হানাদারদের প্রতিপক্ষ কারা ছিল? তারা কি নিরস্ত্র জনগণ! নিরস্ত্র জনগণ কেন হামলার শিকার হলেন! কারা তাদের হামলা করল এবং কাদের কারণে ওই রাতের গণহত্যা সংঘটিত হলো! ইতিহাসের নির্মম বাস্তবতায় যখন এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজা হবে তখনই বের হয়ে আসবে নতুন কিছু নির্মম সত্য।
১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান নিয়েও ব্যাপক গবেষণার প্রয়োজন আছে। প্রয়োজন আছে নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থান, গণজাগরণ মঞ্চের উত্থান এবং হেফাজতের উত্থান বিষয়ে গবেষণা। জাতির ক্ষত দূর করার জন্য দরকার পড়বে রক্ষীবাহিনী, র‌্যাব, অপারেশন ক্লিনহার্ট এবং ১/১১'র সময়ে সংঘটিত অনিয়ম, দুর্নীতি, অনাচার, জুলুম, নির্যাতন, গুম, হত্যা ইত্যাদি নিয়ে খোলামেলা আলোচনা এবং চুলচেরা বিশ্লেষণ। আমাদের খুঁজে বের করতে হবে কেন শান্তি বাহিনীর সৃষ্টি হলো, কেন দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে প্রায় দুই দশক ধরে চরমপন্থিরা ব্যাপক সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করল এবং সর্বশেষে চারদলীয় জোট সরকারের আমলে জঙ্গিদের উত্থান হলো।
৫৬ হাজার বর্গমাইল এলাকার ভূখণ্ডে ১৭ কোটি লোকের বাস! পৃথিবী সৃষ্টির পর কোনো ভূখণ্ডে এত সংখ্যক জিন-পরী বা ফেরেশতা বাস করত কিনা, তা আমি বলতে পারব না। কিন্তু হজরত আদম (আ.) থেকে আজ অবধি এই সুদীর্ঘ মানবজাতির ইতিহাসে কোনোকালে, কোনো দেশে এত লোক একসঙ্গে বাস করেনি। শুধু সংখ্যার বিচারে নয়, আরও অনেক বিষয় রয়েছে, যা রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের ভাবিয়ে তুলেছে। ১৭ কোটি লোক একই ভাষায় কথা বলে। তাদের খাদ্যাভ্যাস একই রকম। তারা একই সময় ঘুমায় এবং একই সময় জেগে থাকে। ধর্মীয় বিশ্বাসে শতকরা ৯০ জন মুসলিম। তাও আবার সুনি্ন এবং হানাফি মাজহাবের। তাদের পোশাক-পরিচ্ছদ, রুচিবোধ, শিষ্টাচার এবং চলন-বলনের ঢংও প্রায় এক। তাদের হৃদয়ঘটিত ব্যাপার-স্যাপার অর্থাৎ প্রেম-ভালোবাসা, ঘৃণা-ক্রোধ, উত্তেজনা এবং অস্থিরতাও প্রায় একই ধরনের। গায়ের রং, চেহারা-সুরত এবং চুলের রঙের এত মিল দুনিয়ার অন্য কোনো সম্প্রদায়ের মধ্যে পাওয়া যাবে না। বাঙালিরা একসঙ্গে থাকতে, একসঙ্গে ঘুমোতে এবং একসঙ্গে খেতে পছন্দ করে। তারা দলবেঁধে নেতার কথা শুনে এবং ন্যায়-অন্যায় না বুঝেই মাথা ঝাঁকাতে থাকে। আবার বেয়াদবি এবং অবাধ্যতার সময়ও দলবেঁধে নিষ্ঠুরতা চালায়। আপনারা হয়তো প্রশ্ন করতে পারেন এসব কথার মানে কি? আমি বলব, যখন বাঙালির সমন্বিত কণ্ঠ হাঁ-সূচক ভোট দেয় তখন ভোটপ্রাপ্ত বিজয়ীকে মনে রাখতে হবে, না ধ্বনিও কিন্তু সবাই মিলে একসঙ্গে উচ্চারণ করবে। বাঙালি তার ধর্মকর্ম, খাদ্য, ঘুম এবং বিনোদনের ক্ষেত্রে যেভাবে হুটহাট করে সমন্বিতভাবে একত্রিত হয়ে যায় তদ্রূপ রাজনীতির ক্ষেত্রেও হুটহাট করে একত্র হয়ে যায়- যা কিনা অতীব আশ্চর্য এবং ভয়াবহ ব্যাপার। আমরা আলোচনার একদম শেষ পর্যায়ে এসে গেছি। যদি অল্প কথায় শেষ করতে হয় তবে বলব, বাঙালি পরিবর্তন চায়- পরিবর্তন ভালোবাসে। বাঙালি কোনো দিন কোনো বিষয় নিয়ে স্থায়ী অবস্থানে থাকেনি। কোনো বাধা মানেনি, আবদ্ধও থাকেনি। ক্ষণে ক্ষণে মতাদর্শ পরিবর্তন করেছে। হাজার বছরের ইতিহাসে আমাদের এই ভূখণ্ডের সীমারেখাও পরিবর্তন হয়েছে কয়েক হাজারবার, কখনো ঝড়, বৃষ্টি, বন্যা বাদল দ্বারা, আবার কখনো বা নদী-সমুদ্র এবং ভূমিকম্প দ্বারা। কখনো অন্তর্দ্বন্দ্ব বা আত্দকলহ দ্বারা এবং কখনো বা বিদেশি আক্রমণকারীদের দ্বারা। কাজেই এমন একটি কম্পমান সমাজের অস্থির মনের ওপর চেষ্টা করলেও কেউ দীর্ঘদিন বসে থাকতে পারবে না আবার তাদের ওপর কোনো কিছু চাপিয়েও দেওয়া যাবে না। 
লেখকঃ গোলাম মাওলা রনি
রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব

শেয়ার করুন

পাঠকের মতামত