আপডেট :

        নগদে ভাড়া নেওয়ার সুযোগ দিল উবার, চালকদের উদ্বেগ বাড়ছে নিরাপত্তা নিয়ে

        দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ার হোম ডিপো থেকে কোটি ডলারের পণ্য চুরি, ১৪ জন গ্রেপ্তার

        ওষুধ নয়, অস্ত্রোপচারও নয়: সহজ হাঁটার কৌশলেই আর্থ্রাইটিস ব্যথা কমাতে সাফল্য বিজ্ঞানীদের

        জাতিসংঘে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক পরিষদ গঠনের উদ্যোগ

        সনাতন ধর্মীয় তীর্থস্থানে উসকানি প্রতিরোধে প্রশাসনকে নির্দেশ

        বিজরীর প্রতিধ্বনি: নজরুলের গানে নারীর স্বাধীনতার স্বর

        পোষা বিড়ালের মায়া: একাকী মুহূর্তে সত্যিকারের সঙ্গী

        পোষা বিড়ালের মায়া: একাকী মুহূর্তে সত্যিকারের সঙ্গী

        মোদি-ট্রাম্পের বন্ধুত্ব ভেঙে পড়ল: 'অত্যন্ত ভয়ংকর' বলে ট্রাম্পের তিরস্কার, ভারতে রাজনৈটিক ঝড়!

        হিজাব নিয়ে বিতর্কে ভিকারুননিসার শিক্ষিকা বরখাস্ত, তদন্তের প্রতিশ্রুতি

        প্রেমের গল্পে নতুন অধ্যায়: টেলর সুইফট-কেলসের বাগদানে উচ্ছ্বাস!

        ডাচ ক্রিকেট দলে নতুন মুখ: সিলেটে বাংলাদেশ সিরিজের জন্য তিন পরিবর্তন

        শহীদ আবু সাঈদ হত্যা মামলায় আজ থেকে আনুষ্ঠানিক বিচার শুরু

        অস্ট্রেলিয়ার সিদ্ধান্তকে 'দুর্বল নেতৃত্বের ফল' বলে আখ্যায়িত করল ইরান

        দক্ষিণ লস এঞ্জেলেসে গুলিবর্ষণে আহত ৫ জন

        ট্রাম্পের ঘোষণা: ওয়াশিংটন ডিসির খুনের মামলায় মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হবে

        ক্যালিফোর্নিয়ার অ্যাকটনে গাড়ির ভেতরে দুইজনের মরদেহ উদ্ধার

        মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে বাংলাদেশের জয়: ৩৭% শ্রমিক বাংলাদেশি

        স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে মারা গেলেন ‘কেজিএফ’ অভিনেতা দিনেশ মাঙ্গালোর

        সাকিবের মনের শান্তি: পরিবারের সঙ্গে কাটানো সময়

ঢাকা হারিয়ে ফেলেছে বাসযোগ্যতা

ঢাকা হারিয়ে ফেলেছে বাসযোগ্যতা

রাজধানী ঢাকা যে ন্যূনতম বাসযোগ্যতা হারিয়ে ফেলেছে এটা বুঝতে অক্ষম নন নীতিনির্ধারকরা। যারা সরকার চালাচ্ছেন তাদের ৮০ শতাংশেরই শৈশব-কৈশোর ও যৌবন কেটেছে শান্তশিষ্ট সবুজের বেষ্টনীতে ঘেরা এই শহরে। ৫৩টি প্রবহমান খালের শোভাও বাসিন্দাদের নানা বৈচিত্র্যের সোহাগে লালন করত। আজ সেই খাল বেদখল হয়ে বাড়িঘরে ভরে গেছে, কিংবা সরকারই রাস্তা বানিয়েছে। অথচ এই শহরে প্রতি প্রাতে সড়কগুলোতে পানি ছিটানোর গাড়ি আমি যেমন দেখেছি, তেমনি আমার বয়সী ও আরো বয়স্করাও দেখেছেন। গত শতকের ছয়-এর দশকে আমি টাঙ্গাইলের মতো ছোট শহরেও রাস্তায় পানি ছিটানোর গাড়ি দেখেছি ধুলা মারার কাজে।

প্রতিদিনই স্নিগ্ধ একটি বাতাস আমাদের নগরজীবনকে নানাভাবে শুশ্রƒষা দিত। তখন পর্যন্ত ঢাকা ছিল বাংলাদেশের মতোই একটি বৃহৎ সবুজ গ্রাম। কিন্তু মাত্র ৫০ বছরে সেই স্নিগ্ধ শহরটি হারিয়ে গেছে ইটের তৈরি বিশাল বিশাল ইমারতের নিচে। সেই আকাশচুম্বী দালানকোঠার নিচে পড়ে গাছগুলো চিরতরে হারিয়ে গেছে। গাছ কাটার সেই ধুম আজো অব্যাহত, যখন এই ঢাকার কোনো কোনো আবাসিক এলাকার (বসুন্ধরা) গাছ নিয়মিতই কেটে ফেলা হচ্ছে। কেন তারা কাটছেন, তার কোনো যৌক্তিক কারণ কেউ দেখান না। বলেন, আমার গাছ আমি কাটি, তাতে আপনার কী? সিটি করপোরেশন যদি বলে, জবাবদিহি করুনÑ কেন গাছ কাটলেন। জবাব হবে, আমার গাছ আমি কেটেছি, আপনি বলার কে? সিটির আইনে কী আছে আমি জানি না, তবে আমি একটি সত্য কথা জানাই আপনাদের। তখন আমি থাকি ঢাকার বাইরে, দেশেরও বাইরে, ক্যালিফোর্নিয়ার লস এঞ্জেলেসের পাশের একটি কাউন্টি শহর সান বারনারডিনোতে। আমার বন্ধু ইসমাইলের বেশ কয়েকখান বাড়ি সেই শহরে। আমি ইসমাইলের সাথে তার একটি বাড়ির আঙিনায় গেছি বাড়ির হাল দেখতে। দেখি বেশ কয়েকটি গাছ সেখানে। কিন্তু কোনো পরিচর্যা নেই। প্রায় জঙ্গলাকীর্ণ অবস্থা দেখে তাকে বললাম, গাছগুলো কেটে জায়গাটা পরিষ্কার করো। সে হাসল। সিটির পারমিশন ছাড়া গাছের কিছুই কাটা যাবে না। এমনকি ডালও। আমি বিস্মিত। আমেরিকার প্রতিটি শহরে সিটির পারমিশন ছাড়া গাছের পাতাও ছাঁটকাট করা যায় না। সিটি নোটিশ পাঠায় বাড়ির সামনের ঘাস কেটে সাফ করতে, প্রতি মাসে। সময়মতো ঘাস না কাটলে ফাইন দিতে হয়, আবার ঘাসও কাটতে হয় নিজেকেই। ঘাস-কাটার কামলাদের মজুরি কিন্তু বেশ মোটাসোটা, হেলা করার কিছু নেই। একইভাবে স্নো সরানোর জন্যও অনেক অর্থ ব্যয় করতে হয়, কিংবা নিজেকেই করতে হয়। আমি বেশ কয়েক বছর নিউ ইয়র্কেও বাস করেছি। সেখানে এটা দেখেছি। কোনো দিন কাউকে কোনো গাছ কাটতে দিখিনি। ম্যানহাটানের মধ্যখানে সেন্ট্রাল পার্ক, গাছপালার সে কী শোভা! আমি প্রায়ই সেই পার্কের গাছের ছায়ায় ক্লান্তি দূর করতে বসেছি ঘণ্টার পর ঘণ্টা। আর ঢাকার হৃদয়ের মাঝখানে রমনা পার্ক, সেখানে উন্নয়নের কাজে গাছ কাটা হয়েছে। ইট-বালির ঘূর্ণিতে ওই পার্ক এখন সয়লাব। ওই একটাই পার্ক আমাদের, সন্নিহিত সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে অনেক গাছ লাগানো হয়েছিল। সেগুলো এখন বিশাল আকৃতির না হলেও যৌবনপ্রাপ্ত। কিন্তু তার ৭০ ভাগই কেটে ফেলা হয়েছে স্বাধীনতা টাওয়ার বানানোর জন্য। ওই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হতে পারত গাছ রেখেও। নান্দনিক ডিজাইনের মাধ্যমে ওই সব গাছ রক্ষা করেও টাওয়ার ও পন্ড সৃজন করা যেত। সেটি যে করা হয়নি, তা দেখার জন্য জনসভা করার প্রয়োজন পড়ে না। অর্থাৎ আমাদের চিন্তায় নান্দনিক বোধটা তেমন আর নেই, যা অতীতে ছিল।

ছোট আকারের টাউনশিপ ঢাকা খুবই পরিচ্ছন্ন ও পরিকল্পিত ছিল। পুরনো ঢাকা ও বুড়িগঙ্গাকেন্দ্রিক নগরায়নটুকু বাদ দিয়ে। (কারণ ওইটুকু জায়গায় হাজার হাজার বাড়ি তোলা হয়েছিল শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে, মুঘল আমলে।) চার-পাঁচ শ’ বছরের পুরনো শহর হিসেবে ওই এলাকা দর্শনীয়, সন্দেহ নেই। পরে উত্তরের দিকে ছোট নতুন শহরটি পুরানা পল্টন পর্যন্ত বেশ গুছিয়েই করা হয়েছিল। তারপরের অংশটুকু ইতিহাস। আমরা স্বাধীনতা অর্জন করলাম আর সেই আনন্দের বানে ভেসে যেতে যেতে যে যেখানে যেভাবে পেরেছে বাড়ি তৈরি করেছে। বাড়ি নির্মাণের প্ল্যানও ডিআইটি কর্তৃপক্ষ পাস করে দিয়েছে। কেননা, তারা জানেনও না যে একটি শহরের জন্য নগর পরিকল্পনা আছে বা থাকতে হয় বা করতে হয়। একটি মাস্টার প্ল্যান করে এই সমস্যার সমাধান করা যেত; কিন্তু গায়ের লোকেরা যেমন ডিসপেনসারির সহকারীকে ডাক্তার মনে করে তেমনি আমাদের কর্তারাও নিজেদের ইঞ্জিনিয়ারদের মনে করেছিলেন; তারাই সিটির প্ল্যানার বা নগর পরিকল্পক। ঢাকাকে ইট-সিমেন্টের বিশাল হাইরাইজের বস্তিতে পরিণত করতে তারাই বেশি অবদান রেখেছেন। আর নব্য ভ‚মিখোরদের সাহায্যকারী হিসেবে তো ছিলোই ভ‚মি মন্ত্রণালয়ের, সেটেলমেন্টর লোকজনরা এবং আজকের রাজউক। সিএস/আরএস পরচা ইত্যাদি তৈরিকারকরা তো আরো একধাপ উপরের মন্দলোক, যারা অর্থের বিনিময়ে গণভবনও যে কোনো দাবিদারের নামে নাম খারিজ করে দিতে কসুর করবে না। এই হচ্ছে ঢাকা মহানগরের ও গোটা দেশের ভ‚মি ব্যবস্থাপনার মোটামুটি বিশ্বাসযোগ্য চিত্র। তো, এই ক্রমবর্ধমান মহানগরকে একটি মাস্টার প্ল্যানের ভেতরে আনতে হলে এখন সরকারকে হিমশিম খেতে হবে। তার চেয়ে এই নগরকে এভাবে চলতে দিয়ে, ঢাকা থেকে সরিয়ে রাজধানী শহর আলাদা জায়গায় তৈরি করে নেয়া অনেক সহজ ও উচিত।

মালয়েশিয়া তার রাজধানী পুত্রজায়াতে নিয়ে গেছে এ-কারণেই। সেই রাজধানী শহরে বেশি লোক বাস করে না। রাজধানীর কর্মজীবীরা কুয়ালালামপুরে বাস করেন। আমেরিকায়ও, রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসির আশপাশের স্টেটে বাস করে। কাজের জন্য তারা সেখান থেকে ডিসিতে আসেন। সব রকম কমিউনিকেশন ব্যবস্থা এতটা মসৃণ যে ১০০ কিমি রান করতে তারা কষ্টবোধ করে না। দিনের কাজ শেষে তারা বসবাসের শহরে ফিরে যায়। ঢাকা মহানগরকে বাঁচাতে হলে এ-রকম একটি পরিকল্পনা নেয়া যেতে পারে। তবে সেই পরিকল্পনায় থাকতে হবে সরকার ও জনগণের মধ্যেকার পারস্পরিক যোগাযোগের সেতু। জনগণ যাতে সহজে রাজধানীতে আসতে পারে এবং কাজ সেরে বিনা বাধায় বাসস্থানে ফিরে যেতে পারে সেটি নিশ্চিত করতে হবে।

এখানে সৃজনশীলতার একটি প্রশ্ন আসে। সৃষ্টিশীল মানুষ সবসময়ই চায় নতুন কিছু করতে। তার জন্য সরকারকে সেই রকম স্পেস রাখতে হবে তার কর্মধারার মধ্যে, যাতে সেবাপ্রাপকদের চাহিদা মোতাবেক সহযোগ দেয়া যায়। একটি উদ্ধৃতি দেয়া যাকÑ

এ বিষয়ে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক আইনুন নিশাত একটি দৈনিককে বলেন, ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে ঢাকা ছিল বিশ্বের অন্যতম সুন্দর পরিবেশের শহর। বিশ্বের অন্যতম সেরা উদ্ভাবনগুলো হতো এই শহরকে কেন্দ্র করে। মসলিন, জামদানি থেকে শুরু করে মৃৎশিল্পের অন্যতম বড় বাণিজ্যকেন্দ্র ছিল এই শহর; কিন্তু অপরিকল্পিত নগরায়নের কারণে শহরের সামগ্রিক পরিবেশের দ্রæত অবনতি হয়েছে। ঢাকা শহর এখন প্রায় ‘লাইফসাপোর্টে’ চলে গেছে। এর দ্রæত ও জরুরি চিকিৎসা করতে হলে চিহ্নিত সমস্যাগুলো দ্রæত সমাধান করতে হবে। (প্রথম আলো/৮ এপ্রিল,২২)

অধ্যাপক আইনুন নিশাতের পরামর্শ অনুযায়ী সময় হয়েছে ‘লাইফসাপোর্টে’ থাকা ঢাকাকে বাঁচাতে একটি কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণ ও তার বাস্তবায়ন। সেই পরিকল্পনা কী হবে, তা নিয়ে ভাবতে হবে আমাদের সৃজনশীল প্রতিভাধর মানুষকে। তাদের ভাবনা থেকেই বেরিয়ে আসবে আগামী দিনের নতুন কিছু, যা হয়তো আমাদের মনে সুপ্ত অবস্থায় আছে। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, আমাদের সরকারের জ্ঞানী ও প্রজ্ঞাবানেরা নতুন কিছু ভাবতেই শেখেননি। তারা ক্ষমতার কেন্দ্রের দিকে হাপুস নয়নে তাকিয়ে থাকেন। তারা যে ভাবনার জগতের চেয়ে ক্ষমতাবানের স্নেহ-নির্দেশ ও ভালোবাসা পেতে আগ্রহী, সেটিই প্রমাণ করে চলেছেন। এই চক্কর, মানে ক্ষমতার ঘূর্ণি চক্কর থেকে বেরিয়ে স্বাধীনভাবে চিন্তার জানালা উন্মুক্ত করতে হবে তাদের। লেজুড়বৃত্তি করে কোনো সৃজন সম্ভব নয়।

ধরা যাক, সরকার ঢাকার ইট-সিমেন্ট আর স্থবির জীবন পরিবেশ থেকে প্রশাসনকে বাঁচাতে রাজধানী অন্য কোথাও নিয়ে গেলেও সেখানে যেন বেহুদা (রাজনৈতিক/সামাজিক তদবিরবাজ) মানুষ যেতে না পারে, সেটি কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। নিউ ইয়র্ক রাজ্যের রাজধানী আলবানি শহরে। যার প্রয়োজন, তিনি সেখানে দুই ঘণ্টার ড্রাইভে যান, আবার কাজ শেষে ফিরে আসেন। এটা একটি উদাহরণ মাত্র। যেমন ক্যালিফোর্নিয়ার রাজধানী সেক্রামেন্টোতে। লস অ্যাঞ্জেলেস ও সান ফ্রান্সিসকো থেকে দূরের পথ। আমাদের অত বড় দেশ নেই। এমনকি নিউ ইয়র্ক বা ক্যালিফোর্নিয়ার মতো স্টেটের মতোও নয় আমাদের দেশের পরিধি। আমাদের জায়গার সঙ্কট, জনগণের তুলনায়। তাই পরিকল্পনা করতে হবে সে-কথা মাথায় রেখেই।

জনগণকে জনশক্তিতে রূপান্তর করা সম্ভব। সেটি করে চলেছে সরকার। এটা দীর্ঘমেয়াদি কাজ। তবে সময় লাগছে অনেক বেশি। সেটিও দুর্বল পরিকল্পনা আর হুজুগি চিন্তার ফলে অনেকটাই এলোমেলো। শিক্ষাক্ষেত্রে যারা কারিগরি ও প্রাযুক্তিক শিক্ষা নিতে চায়, তাদের যোগ্য করে তোলার দায়িত্ব প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে সাথে সরকারেরও। তারা যাতে ভারবাহী হয়ে না ওঠে তার জন্য জব-মার্কেটের পরিকল্পনাও আঁকতে হবে। কত দক্ষ জনশক্তিকে বিদেশে রফতানি করতে প্রাক্কলন করা হয়েছে, সেই অনুপাতে কারিগরি শিক্ষার প্যাটার্নও তৈরি করতে হবে। আর সেসব স্কুল ও কলেজা অবশ্যই ঢাকার বাইরে গড়ে তুলতে হবে। ঢাকার ভেতর থেকে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো স্থানান্তর জরুরি। ঢাকা থেকে গার্মেন্ট কারখানাগুলো সরিয়ে নিতে হবে। সেই সাথে চামড়াশিল্পের স্থানান্তর চূড়ান্ত করতে হবে। নিজেদের আত্মীয়স্বজন, ভাই-ভগ্নি আর রাজনৈতিক সতীর্থ হিসেবে কাউকে ছাড় দেয়া যাবে না। আর দূর করতে হবে ঢাকা থেকে কালো ধোঁয়ার উৎসগুলো।

কালো ধোঁয়ার উৎসগুলো কী কী তা আমাদের সব কিছুর আগে জেনে নিতে হবে। আগে জানতাম ইটভাটা হচ্ছে কালো ধোঁয়ার একমাত্র উৎস। গবেষণা বলছে, কেবল ইটভাটা নয়, আছে গাড়ির কালো ধোঁয়া আর শিল্পকারখানার কেমিক্যাল-মিশ্রিত ধোঁয়া।

বিশ্বের বড় শহরগুলোতে বায়ুদূষণ এখন অন্যতম সমস্যা। কয়েক বছর ধরে ঢাকা সবচেয়ে দূষিত বাতাসের পাঁচটি শহরের মধ্যে রয়েছে। তবে চলতি বছর বিশ্বের বায়ুর মান পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা এয়ার ভিজ্যুয়ালের বার্ষিক প্রতিবেদনে বিশ্বে দূষিত বায়ুর দেশ হিসেবে বাংলাদেশ এক নম্বর হয়েছে। আর শহরের তালিকায় দিল্লির পরেই রয়েছে ঢাকার নাম। এর আগের বছরও ঢাকা এই অবস্থানে ছিল।

এ বিষয়ে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র মো: আতিকুল ইসলাম বলেন, তারা এই শহরের সমস্যাগুলো একে একে সমাধান করছেন। দূষণ রোধ ও নাগরিক সুবিধা বাড়াতে যেসব পরিকল্পনা করা হয়েছে, সেগুলোর বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে। এসব কাজ শেষ করতে পারলে দ্রæত বসবাসযোগ্যতার সূচকে ঢাকার উন্নতি হবে।

ঢাকার বায়ুদূষণের উৎস নিয়ে চলতি বছর প্রকাশিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের এক জরিপ বলছে, রাজধানীর বাতাস এখন বিষিয়ে তুলছে যানবাহনের ধোঁয়া। বায়ুদূষণের অর্ধেক (৫০%) দায়ই মূলত তরল জ্বালানি পোড়ানোর মাধ্যমে তৈরি হওয়া ধোঁয়ার। উন্নয়নের ধুলায় চড়ে যে মেয়াদোত্তীর্ণ গাড়ির কালো ধোঁয়া, শিল্পকারখানার কালো ধোঁয়া, যা কার্বন, কালো কার্বন, কার্বন মনো-অক্সাইড সৃষ্টি করছে সেই সূ² শত্রæর হাত থেকে কেমন করে বাঁচবেন? আমাদের ফুসফুসের নিঃশ্বাস নেয়ার ছিদ্রগুলোকে ওই কালো কার্বন সিল মেরে দিচ্ছে। এই ক্ষতি অ্যাটমিক ক্ষতির মতোই ভয়াবহ। কেউ বুঝতেও পারছে না যে, ধীরে ধীরে তাকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে ঢাকার দূষিত বায়ু।
৪০ ভাগ দূষণের উৎস খড়, কাঠ, তুষের মতো জৈব বস্তুর ধোঁয়া ও সূ² বস্তুকণা। বাকি ১০ শতাংশ দূষিত বস্তুকণা আসে ইটভাটায় কয়লা পোড়ানোর ধোঁয়া থেকে।

রাস্তায় নির্মাণসামগ্রী, বালু, ধুলা সরানোর আপাতত একটাই পথÑ তা হলো যারা ওই সামগ্রী রাখছে, তাদের কঠোরভাবে শাসনে রাখা, যাতে তারা ওই কাজ থেকে বিরত থাকে। সেই সাথে প্রাতঃকালে ঢাকার সড়কে পানি ছিটানোর ব্যবস্থা নেয়া। তবে এ-দু’টি উদ্যোগের আগে, ঢাকায় চলাচলকারী লাখ লাখ বাস-ট্রাকসহ সবধরনের গাড়ির কালো ধোঁয়া রোধ করতে হবে। মেয়াদোত্তীর্ণ, লক্কড়-মার্কা গাড়ি, কালো ধোঁয়া ছাড়ে এমন গাড়ি সড়কে নিষিদ্ধ করতে হবে চিরতরে এবং তা কঠোরভাবে পালন করতে হবে ট্রাফিক পুলিশকে। না হলে লক্ষ্যে পৌঁছানো যাবে না।

মনে মনে সরকারকে ট্রাফিক জ্যামের জন্য গাল দেয় প্রতিটি মানুষ। এই সত্য ঢেকে রাখার মতো নয়। একটি ক্ষুদ্র গোষ্ঠীকে (পরিবহন মালিক) বিশেষ সুবিধা দেবার মানসিকতা বন্ধ করতে হবে। আর সরকারের উচিত, মহানগরকে আর বাড়তে না দেয়া। পাশের জেলা শহর থেকে রাজধানীতে যাতায়াত যদি সহজ ও মসৃণ হয় তাহলে সাভার, নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা, টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহ, গাজীপুরকে উপরাজধানী হিসেবে গড়ে তোলা যায়। প্রয়োজনে ডিজিটালের এই যুগে, সরকারি অনেক অফিস ডি-সেন্ট্রালাইজ করা যেতে পারে। এমনকি অনলাইনে কাজ করা যায়, এমন প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের অফিস হবে তাদের বাসা। তাহলেও রাজধানীতে যানজটের চাপ অনেক কমে আসবে। আর যদি রাজধানী মহানগরকে আরো বাড়তে দেয়া হয়, তাহলে শহর গ্রাস করবে গ্রাম ও কৃষিজমি, যা আমাদের সর্বনাশের শেষ ধাপ বলে চিহ্নিত হবে।
এখন ঠিক করতে হবে আমরা কী করব।

শেয়ার করুন

পাঠকের মতামত