৭৫টি দেশের নাগরিকদের জন্য ভিসা প্রক্রিয়া স্থগিত করছে যুক্তরাষ্ট্র, তালিকায় বাংলাদেশ
ইরানে বিক্ষোভকারীদের ফাঁসি হলে ‘খুব শক্ত প্রতিক্রিয়া’ নেবে যুক্তরাষ্ট্র: ট্রাম্প
ছবিঃ এলএবাংলাটাইমস
ইরানে বিক্ষোভকারীদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হলে যুক্তরাষ্ট্র “খুব শক্ত পদক্ষেপ” নেবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর দাবি, ইরানে চলমান সরকারবিরোধী আন্দোলনে নিরাপত্তা বাহিনীর দমন-পীড়নে এখন পর্যন্ত অন্তত ২,৪০০ জনের বেশি বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছেন।
২৬ বছর বয়সী এরফান সোলতানি নামের এক তরুণের স্বজনরা বিবিসি পার্সিয়ানকে জানিয়েছেন, তাকে গত সপ্তাহে আটক করা হয় এবং বুধবার তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হতে পারে। মানবাধিকার সংস্থা হেঙ্গাও অর্গানাইজেশনের এক প্রতিনিধি জানান, “আমরা আগে কখনও দেখিনি কোনো মামলা এত দ্রুত ফাঁসির পর্যায়ে পৌঁছেছে।”
যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম সিবিএস নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, “যদি তারা মানুষকে ফাঁসি দেয়, তাহলে আপনারা কিছু ঘটনা দেখতে পাবেন। এমন কিছু করা হলে আমরা খুব শক্ত প্রতিক্রিয়া জানাব।”
এরফান সোলতানির এক স্বজন বলেন, মাত্র দুই দিনের মধ্যেই “চরম দ্রুতগতির” একটি বিচার প্রক্রিয়ায় তার বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় দেওয়া হয়েছে। হেঙ্গাওয়ের প্রতিনিধি আওয়ার শেখি বলেন, এই ঘটনা প্রমাণ করে যে ইরানি সরকার “ভীতি ছড়াতে এবং মানুষকে দমনে সব ধরনের কৌশল ব্যবহার করছে।”
ইরানি এক কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, সহিংসতায় প্রায় ২,০০০ মানুষ নিহত হয়েছে, তবে তার দাবি—এই মৃত্যুর জন্য “সন্ত্রাসীরা” দায়ী।
ট্রাম্প বলেন, তিনি মঙ্গলবার রাতে হোয়াইট হাউসে ইরান পরিস্থিতি নিয়ে একটি জরুরি বৈঠকে অংশ নেবেন এবং নিহতের “সঠিক সংখ্যা” জানার চেষ্টা করবেন। “সংখ্যা নিশ্চিত হওয়ার পর আমরা সে অনুযায়ী পদক্ষেপ নেব,” বলেন তিনি।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যাকটিভিস্টস নিউজ এজেন্সি (HRANA) জানিয়েছে, ইন্টারনেট বন্ধ থাকা সত্ত্বেও তারা এখন পর্যন্ত ২,৪০৩ জন বিক্ষোভকারীর নিহত হওয়ার তথ্য নিশ্চিত করেছে। নিহতদের মধ্যে অন্তত ১২ জন শিশু রয়েছে। এছাড়া সরকারপন্থী প্রায় ১৫০ জনও নিহত হয়েছেন বলে দাবি করা হয়।
এর আগে ট্রাম্প তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশালে লেখেন, ইরানি কর্তৃপক্ষকে “বড় মূল্য দিতে হবে” এবং জনগণকে “বিক্ষোভ চালিয়ে যেতে” আহ্বান জানান। তিনি আরও লেখেন, “নিরীহ বিক্ষোভকারীদের হত্যাকাণ্ড বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত আমি ইরানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে সব বৈঠক বাতিল করেছি। সাহায্য আসছে। MIGA!!! (Make Iran Great Again)”
এই সংকটের প্রেক্ষাপটে ট্রাম্প সামরিকসহ বিভিন্ন বিকল্প নিয়ে ভাবছেন বলে জানা গেছে। ইতোমধ্যে তিনি ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য করা যেকোনো দেশের ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছেন।
এর জবাবে ইরান সরকার যুক্তরাষ্ট্রকে অভিযুক্ত করে বলেছে, তারা “সামরিক হস্তক্ষেপের অজুহাত তৈরির চেষ্টা করছে” এবং সতর্ক করে জানিয়েছে—“এই কৌশল আগেও ব্যর্থ হয়েছে।”
দেশটির ৩১টি প্রদেশের অন্তত ১৮০টি শহর ও জনপদে ছড়িয়ে পড়া এই বিক্ষোভ শুরু হয় ইরানি মুদ্রার ভয়াবহ পতন এবং দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির প্রতিবাদে। পরে তা রাজনৈতিক পরিবর্তনের দাবিতে রূপ নেয় এবং ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর এটি সরকারপক্ষের জন্য অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে ওঠে।
গত বৃহস্পতিবার থেকে বিক্ষোভ তীব্র আকার ধারণ করে। ইন্টারনেট ও যোগাযোগ ব্যবস্থা প্রায় সম্পূর্ণ বন্ধ রেখে নিরাপত্তা বাহিনী ব্যাপক শক্তি প্রয়োগ করে আন্দোলন দমন করে।
HRANA-এর তথ্যমতে, এ পর্যন্ত অন্তত ১৮,৪৩৪ জন বিক্ষোভকারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
রক্তপাতের প্রকৃত পরিমাণ নির্ধারণ করা কঠিন, কারণ বিবিসিসহ আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো দেশটির ভেতরে সরাসরি রিপোর্ট করতে পারছে না। তবে রবিবার সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে তেহরানের কাহরিজাক ফরেনসিক সেন্টারে স্বজনদের মরদেহ খুঁজতে দেখা যায়। বিবিসি ওই ভিডিওতে অন্তত ১৮০টি কাফনে মোড়া মরদেহ ও বডি ব্যাগ গণনা করেছে। সোমবার প্রকাশিত আরেকটি ভিডিওতে সেখানে প্রায় ৫০টি মরদেহ দেখা যায়।
এক আন্দোলনকারী বিবিসি পার্সিয়ানকে বলেন, “আমার এক বন্ধু তার ভাইকে খুঁজতে সেখানে গিয়েছিল। সে নিজের দুঃখই ভুলে গিয়েছিল। তারা এলাকা অনুযায়ী মরদেহ স্তূপ করে রেখেছে—সাদাতাবাদ, নাজিয়াবাদ, সত্তারখান। আপনি নিজের এলাকার স্তূপে গিয়ে খুঁজবেন। আপনি কল্পনাও করতে পারবেন না কী মাত্রার সহিংসতা চালানো হয়েছে।”
রাজধানীর হাসপাতালগুলোও আহত ও নিহতদের চাপে ভেঙে পড়েছে বলে জানা গেছে। লন্ডনপ্রবাসী ইরানি অনকোলজিস্ট অধ্যাপক শাহরাম করদাস্তি বিবিসির নিউজডে অনুষ্ঠানে বলেন, তেহরানের এক সহকর্মীর কাছ থেকে পাওয়া শেষ বার্তায় লেখা ছিল— “বেশিরভাগ হাসপাতালে যুদ্ধক্ষেত্রের মতো অবস্থা। আমাদের সরঞ্জাম নেই, রক্ত নেই।”
জাতিসংঘের মানবাধিকার প্রধান ভলকার টুর্ক ইরানি কর্তৃপক্ষকে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে সব ধরনের সহিংসতা ও দমন-পীড়ন অবিলম্বে বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, বিক্ষোভকারীদের “সন্ত্রাসী” আখ্যা দিয়ে সহিংসতা চালানো গ্রহণযোগ্য নয় এবং দ্রুত বিচার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার ইঙ্গিত “চরম উদ্বেগজনক”।
এলএবাংলাটাইমস/ওএম
নিজস্ব প্রতিবেদক
শেয়ার করুন