আপডেট :

        মালিবুতে কিশোর চালকের গাড়ির ধাক্কায় নোবুর দীর্ঘদিনের শেফ নি হ ত

        চীনে ৩০ কোটি ডলারের এআই প্রযুক্তি পাচারের অভিযোগে লস এঞ্জেলেসে প্রযুক্তি কোম্পানির সিইও গ্রে প্তার

        দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ায় তীব্র তাপপ্রবাহ কাটছে না, সপ্তাহান্তেও থাকবে ভয়ংকর গরম

        উত্তর লস এঞ্জেলেস কাউন্টিতে বুকে ফায়ারে নিয়ন্ত্রণ বেড়ে ৪০ শতাংশ

        জলবায়ু ক্ষতির দায়ে তেল কোম্পানিকে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে কি না সিদ্ধান্ত দেবে সুপ্রিম কোর্ট

        ক্র্যাটম সেবনে দুই শিক্ষার্থীর মৃ ত্যু, যুক্তরাষ্ট্রে বাবা-ছেলে গ্রে প্তা র

        কানাডায় যুক্তরাষ্ট্রের আক্রমণের আশঙ্কা কেন আলোচনায়

        যুক্তরাষ্ট্রের উপকূলে নিখোঁজ মেডিকেল বিমানের ধ্বং সা ব শে ষ উদ্ধার

        কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ফ্র্যাটার্নি হাউসে যৌ ন নি পী ড়নের অভিযোগ: দুই বছর পর কেন আবার তদন্ত

        শুক্রবার থেকে দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ায় দীর্ঘ তাপপ্রবাহ, তীব্র গরমের সঙ্গে বাড়ছে আগুনের ঝুঁকি

        সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়ায় মেগা মিলিয়নে ৭.৩ মিলিয়ন ডলারের বেশি জিতলেন এক খেলোয়াড়

        আলতাডেনায় সরিয়ে নিতে ব্যর্থতা, প্যাসিফিক প্যালিসেডসে অব্যবস্থাপনা: দাবানল তদন্তে উঠে এল নানা ভুল

        লস এঞ্জেলেসের কাইজার পারমানেন্টের পার্কিং লটে গাড়ির ভেতর নারীর মরদেহ

        যুক্তরাষ্ট্রে কতটা ব্যাপকভাবে মৃত্যুদণ্ড ব্যবহার করা হয়?

        ব্যর্থ দণ্ড কার্যকরের পর সংকটাপন্ন ক্রাইস্টা পাইক অচেতন অবস্থায় ভেন্টিলেটরে

        ৫ কোটি ডলারের গোপন লবিং কাণ্ডে সাবেক মার্কিন কংগ্রেসম্যানের ১০ বছরের জেল

        ল্যাঙ্কাস্টারের প্রত্যন্ত সম্পত্তিতে মাটির নিচে পাওয়া দুই মরদেহের পরিচয় শনাক্ত

        জনপ্রিয় বিষয়ে পড়েও বেশি বেতনের চাকরি মিলছে যেসব ক্যালিফোর্নিয়ার কলেজে

        মালিবুতে স্পিড ক্যামেরার পরীক্ষাতেই ধরা পড়ল ১ লাখের বেশি গতিসীমা লঙ্ঘন

        ক্যাটালিনা দ্বীপের কাছে হেলিকপ্টার দুর্ঘটনা নিহতদের বিষয়ে নতুন তথ্য

ভালোবাসার শহরে লৌহকঙ্কালের রহস্য: এক অপ্রত্যাশিত দৃশ্য

ভালোবাসার শহরে লৌহকঙ্কালের রহস্য: এক অপ্রত্যাশিত দৃশ্য

যেন কবিতার কোনো লাইন, অথবা প্রেমিকাকে সম্বোধন করা কোনো একটি নাম–প্যারিস। বিশ্বের যত শহর, তার মধ্যে প্যারিসের আবেদন একেবারে আলাদা, অন্যরকম। শহরটি কেবল চোখে পড়ার মতো নয়, হৃদয়ের গভীরেও ধারণ করার মতো। প্রথম যখন প্যারিসে পা রাখলাম, তখন মনে হয়েছিল, এটি কোনো শহর নয়, যেন প্রেমিকাকে দেখছি। প্রতিটি গলি, নান্দনিক বাড়ি, প্রতিটি জানালা, আর কফিশপ– সব খানেই একধরনের মাদকতা কিংবা রোমান্টিক জাদু মিশে আছে। সে জাদু আপনাকে মাতাল করে ফেলবে, মুগ্ধ করে তুলবে। এই জাদুর শিখরই যেন আইফেল টাওয়ার। প্যারিসে লোহার তৈরি স্মৃতি আর প্রেমের নীরব ভাষা!

প্যারিস শহরজুড়ে ঘোরার পর একদিন গিয়ে দাঁড়ালাম আইফেল টাওয়ারের সামনে। যে টাওয়ার ইতিহাস, প্রেম আর গর্বের এক উচ্চতম মিনার হয়ে দণ্ডায়মান। শরীরে এক ধরনের আবেশ বয়ে গেল।

এতদিন সিনেমা কিংবা ছবিতে দেখে আসা এই টাওয়ার জীবন্ত হয়ে উঠল চোখের সামনে। তখন মনে পড়ল বিখ্যাত ফরাসি কবি শার্ল বোদলেয়ারের করা উক্তিটি। তিনি বলেন, ‘প্রত্যেক শিল্পীরই দুটি মাতৃভূমি। একটি, যেখানে সে জন্মেছে; অন্যটি ফ্রান্সে।’ উক্তিটি আগে তেমন ভাবায়নি। প্যারিস শহর দেখার পর বারবার যেন শার্ল বোদলেয়ারের উক্তিটি মনে পড়ছিল।

কিন্তু বিপরীত উক্তিও আছে। এই যেমন আইফেল টাওয়ারকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কেবলই লৌহকঙ্কাল বলে বর্ণনা করেছেন। তাঁর দৃষ্টিতে এটি আদতে ১ হাজার ৬৩ ফুট উঁচু এক লৌহকঙ্কাল ছাড়া কিছুই নয়। কিন্তু লৌহকঙ্কালটি কাছে গিয়ে দেখতে গিয়ে বুঝলাম প্রায় ৩৩০ মিটার উঁচু এই টাওয়ারটি শুধু একটি স্থাপনা নয়–এটি যেন ফ্রান্সের আত্মার প্রকাশ। প্রায় আধা কিলোমিটার দূর থেকে টাওয়ারটি মাথার ওপর তাকাতেই প্রথমে যে কথাটি মনে হলো তা হলো– টাওয়ারটি যেন আকাশকে ছুঁয়ে বলছে, ‘আমি প্যারিস, আমি স্বপ্ন’।

প্রতি বছর এই স্বপ্নের টানেই লাখ লাখ মানুষ এখানে আসেন। তাদের দলে এবার শামিল আমিও। ফ্রান্স সরকার এই লৌহকঙ্কালটি এতটাই জোরালোভাবে বিশ্ববাসীর সামনে উপস্থাপন করছে যে প্যারিসে এসে আইফেল টাওয়ার দর্শন না করলে মনে হবে ফ্রান্স ভ্রমণ বৃথা। আরও বেশি বৃথা মনে হবে যদি আইফেল টাওয়ারে চড়ে প্যারিসের শোভা উপভোগ না করা যায়। যদিও প্যারিসের যেকোনো প্রান্ত থেকে আইফেল টাওয়ার দর্শন সম্ভব। সেটি কেবলই দর্শন। ছুঁয়ে দেখা নয়, উপলব্ধি করা নয়। উভয়ের জন্য এর কাছাকাছি আসতে হবে। টাওয়ারে চড়তে হলে আপনাকে ২৫ ইউরো খরচ করতে হবে। এ জন্য আগে থেকেই টিকিটও কাটতে হবে। 

ছোট একটা তথ্য জানিয়ে রাখি, আইফেল টাওয়ার যখন ১৮৮৯ সালে নির্মিত হয়, তখন সেটিই ছিল বিশ্বের সর্বোচ্চ মানবসৃষ্ট স্থাপনা। টানা ৪১ বছর এই গৌরব ধরে রেখেছিল টাওয়ারটি। সময়ের সঙ্গে বদলেছে প্রযুক্তি ও দৃষ্টিভঙ্গি। এখন বিশ্বের শীর্ষ ১০০ উঁচু ভবনের তালিকায় আইফেল টাওয়ার নেই। উচ্চ ভবন নির্মাণ এখন অনেক দেশের জন্য সম্মান ও প্রতিযোগিতার বিষয়। আকাশ ছোঁয়ার এই দৌড়ে শীর্ষে রয়েছে দুবাইয়ের বুর্জ খলিফা–উচ্চতা ২ হাজার ৭১৭ ফুট। ভবিষ্যতে এই শীর্ষস্থান কতদিন টিকবে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

১৮৮৯ সালের এক বিশ্বমেলার জন্য গুস্তাভ আইফেলের তৈরি এই লোহার কাঠামোটি প্রথমে অনেক বিতর্কের জন্ম দিয়েছিল। অনেকেই একে ‘লোহার দানব’ বলে তিরস্কার করেছিল। সময়, ভালোবাসা আর শিল্পবোধ একে করে তুলেছে পৃথিবীর সবচেয়ে আকর্ষণীয় নিদর্শনগুলোর একটি। এমনকি ফ্রান্সের প্রতীক হিসেবেও একে ধরা হয়।

প্যারিসে সূর্য ডুবে রাত ১০টার দিকে। আমরা আইফেল টাওয়ারে পৌঁছেছিলাম বিকেল ৪টায়। চারদিকে তখন সূর্যের তেজহীন কিরণ। সেই কিরণে ছবি তোলার ধুম পড়েছে চারপাশে। যে যার মতো ঢঙে ছবি তুলছেন। কেউ বিয়ের পোশাকেও এসেছেন দেখলাম। মুহূর্তটা আরও রাঙিয়ে তুলতে এখানে ওয়েডিং ফটোগ্রাফি করতে আসা। প্রথম দেখার পর আমি দাঁড়িয়ে রইলাম দীর্ঘক্ষণ। এর আরও কাছাকাছি যেতে ধীরে ধীরে চলতে শুরু করলাম।

একটু জানিয়ে রাখি, আইফেল টাওয়ারের পাশেই রয়েছে একটি সবুজ বাগান, সেই বাগানের এক প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে একটি অনন্য স্মৃতিস্তম্ভ–‘শান্তির দেয়াল’। জেরুজালেমের ‘কান্নার দেয়াল’ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে শিল্পী ক্লারা হ্যাল্টার ও স্থপতি জিন মাইকেল উইলমোট এটি নির্মাণ করেন, বিশ্বে শান্তির বার্তা ছড়িয়ে দেওয়ার আশায়। ১৬.৪ মিটার দীর্ঘ, ১৩.৮ মিটার প্রস্থ ও ৯ মিটার উচ্চতার এই কাঠ ও কাচের দেয়ালে ৪৯টি ভাষায় লেখা রয়েছে ‘শান্তি’। চারপাশে দাঁড়িয়ে থাকা ৩২টি লোহার দণ্ড যেন বিশ্বমানবতার প্রতীক। ২০০০ সালে ফ্রান্সের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জ্যাক শিরাক এর উদ্বোধন করেছিলেন।

প্রথমদিকে এই স্মৃতিস্তম্ভে দর্শনার্থীরা কাছাকাছি যেতে পারতেন, শান্তির বাণী লিখতে পারতেন। সেই সুযোগ এখন নেই। স্মৃতিস্তম্ভের চারপাশে লোহার বেষ্টনী দেওয়া হয়েছে। বলতে গেলে স্মৃতিস্তম্ভের কাছাকাছি যাওয়া নিষেধ। তবে দর্শনার্থী যারা আইফেল টাওয়ার দেখতে আসেন তাদের অনেকেরই এই দুটি স্মৃতিস্তম্ভ চোখে পড়ে না। না পড়ারই কথা। চোখের সামনে এমন বিশাল আইফেল টাওয়ার থাকলে এমনটি হওয়ার কথা। 

হেঁটে হেঁটে একদম কাছাকাছি পৌঁছে গেলাম। সঙ্গী হিসেবে পেয়েছিলাম প্রবাসী আসাদুজ্জামন অভি, শুভ,সাইফুল ইসলাম ও মাহফুজুর রহমান নাফিজ। বলতে গেলে তারা ছিল বলেই প্রেমিকার মত প্যারিস শহর হয়ে উঠেছিল আরও দর্শনীয়। খুটিনাটি বিষয়গুলো তারাই জানিয়ে দিয়েছেন। আইফেল টাওয়ারের অলিগলি তাদের কল্যাণেই খুটিয়ে খুটিয়ে দেখার সুযোগ হয়ে উঠেছিল। 

টাওয়ারের চূড়ায় উঠলাম এলিভেটরে করে। নিচে তাকিয়ে শহরের চিত্র দেখে মনে হলো, আমি যেন কোনো মহাকাব্যের পৃষ্ঠায় বসে আছি। প্যারিস শহরের ছাদগুলো যেন গানে ভরা, সেই গানে ভেসে আসে শিল্প, সাহিত্য, বিপ্লব আর ভালোবাসার স্মৃতি। দূরে সিন নদী, ধীরে বইছে। তার তীরে জড়ো হয়ে আছে শতাব্দীর পর শতাব্দীর কাহিনি। সেখানে থাকতে থাকতেই যেন সূর্য ডুবু ডুবু ভাব।

অবাক হলাম সূর্য ডুবের যাওয়ার পর। এতক্ষণ যে টাওয়ারকে দেখলাম, যে রূপ দেখলাম সেটি এবার ম্লান। নববধূর মতো নতুন রূপে নতুন সাজে ধরা দিল টাওয়ার। অন্ধকার নামতেই টাওয়ারের গায়ে জ্বলে উঠল হাজারো বাতি, মনে হলো, এটি কোনো লোহার কাঠামো নয়–এ যেন এক জীবন্ত জ্যোতির্ময়ী নারী, শহরের বুকজুড়ে দাঁড়িয়ে প্রেমের ঘোষণা দিচ্ছে। শহরের প্রতিটি প্রান্ত থেকে তাকে দেখছে অসংখ্য চোখ।

পাশে ফরাসি এক বৃদ্ধ দম্পতি একে অপরের হাত ধরে তাকিয়ে আছেন টাওয়ারের দিকে। আমার কেন যেন মনে হতে লাগলো পঞ্চাশ বছর আগে তারা হয়তো এখানেই প্রেমে পড়েছিলেন, যে প্রেমে ডুবে আছেন এখনও....। 


এলএবাংলাটাইমস/আইটিএলএস

শেয়ার করুন

পাঠকের মতামত