গ্রাহকসেবায় ৫ মিনিটের বেশি অপেক্ষা নয়: ক্যালিফোর্নিয়ায় নতুন বিল, মানবিক যোগাযোগ নিশ্চিতের উদ্যোগ
তারা কাদলেন এবং কাদালেন !
১৯ জনের গুম হওয়ার দুই বছর
কেউ বলতে বলতে কাঁদছেন, কেউ শুনতে
শুনতে। সবার চোখ ভেজা। বক্তব্যের
চেয়ে কান্নার শব্দই বেশি। গতকাল
শুক্রবার রাজধানীর জাতীয়
প্রেসক্লাব মিলনায়তনে এক সংবাদ
সম্মেলনে জড়ো হয়েছিলেন ১৯ জন গুম
হয়ে যাওয়া মানুষের স্বজনেরা। তাঁরা
তাঁদের নিখোঁজ স্বজনদের ফিরে
পাওয়ার আর্তি নিয়ে এভাবে
কান্নাভেজা চোখে দুই বছর ধরেই কথা
বলে যাচ্ছেন।
তবে এখন পর্যন্ত কোনো লাভ হয়নি।
এমনকি নিখোঁজ ব্যক্তিরা বেঁচে
আছেন না মারা গেছেন, সে তথ্যও
স্বজনদের জানায়নি কেউ। স্বজনেরা
বলছেন, তাঁদের অনেককেই প্রকাশ্যে
তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল বিভিন্ন
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর
পরিচয়ে। এখন সবাই অস্বীকার করে
যাচ্ছে।
গতকালের সংবাদ সম্মেলনে লিখিত
বক্তব্য পাঠ করেন নিখোঁজ হওয়া
রাজধানীর ৩৮ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির
সাধারণ সম্পাদক সাজেদুল ইসলাম ওরফে
সুমনের বোন সানজিদা ইসলাম।
হারিয়ে যাওয়া ১৯ জনের মধ্যে
বেশির ভাগই বিএনপির রাজনীতির
সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ২০১৪ সালের ৫
জানুয়ারি নির্বাচনের আগে ২০১৩
সালের নভেম্বর থেকে ডিসেম্বরে এই
১৯ জন রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা
থেকে নিখোঁজ হন, কয়েকজনকে
পরিবারের সদস্যদের সামনে বাসা
থেকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়।
লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, ২০১৪ সালের ৫
জানুয়ারির বিতর্কিত নির্বাচনকে
কেন্দ্র করে দেশে রাজনৈতিক
সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। এ সময় অনেক
গুমের ঘটনা ঘটে। মূলত ভিন্নমতাবলম্বী
রাজনৈতিক কর্মীরা এর শিকার হন, যা
এখনো অব্যাহত রয়েছে। গুম রাষ্ট্রীয়
নিপীড়নের একটি হাতিয়ার। মূলত
রাষ্ট্র যাঁদের শত্রু হিসেবে চিহ্নিত
করে, তাঁদের বিরুদ্ধে শান্তিশৃঙ্খলা
রক্ষার নামে এই গুমের প্রয়োগ করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে যোগ দিতে
এসেছিলেন সন্তানহারা বৃদ্ধ পিতা-
মাতা, বাবাহারা ছোট্ট শিশুও। এদেরই
একজন, নিখোঁজ পারভেজ হোসেনের
মেয়ে হৃদি হোসেন মাইক্রোফোন
হাতে নিয়ে বক্তব্য দেয়। সে বলে,
‘আমার বাবাকে ফিরিয়ে দিন।
বাবার সঙ্গে আমি স্কুলে যাব। মা
আমাকে আইসক্রিম কিনে দেয় না,
মায়ের পয়সা নাই। বাবা আমাকে
আইসক্রিম দিবে, শিশু পার্কে নিয়ে
যাবে। বাবাকে অনেক দিন দেখি
না।’
হৃদির পরে বক্তব্য দেন নিখোঁজ তরুণ
আদনান চৌধুরীর বাবা রুহুল আমিন।
তিনি বলেন, ‘আমি মৃত্যু পথযাত্রী।
কিন্তু তার আগেই আমার ছেলেটা
হারিয়ে গেল। অনেক কষ্টে গড়া
ছেলে। র্যা বের পোশাক পরা লোকজন
ছিল। তারা বলেছিল, “নিয়ে যাচ্ছি,
দিয়ে যাব।” এরপর র্যা বের অফিসে
গেলাম, কত জায়গায় খুঁজলাম, ছেলের
কোনো খোঁজ পেলাম না।’
বিমানবন্দর থানা ছাত্রদল শাখার যুগ্ম
সম্পাদক নিজাম উদ্দিন মুন্নার বাবা
শামসুদ্দিন ছেলেকে জীবিত পাওয়ার
আশা ছেড়ে দিয়েছেন। তিনি বলেন,
২০১৩ সালের ৬ ডিসেম্বর রাতে
মোল্লারটেকের বাড়ির সামনে
থেকে ডিবি পুলিশ লেখা
মাইক্রোবাসে করে নিজামউদ্দীন ও
তাঁর বন্ধু তরিকুল ইসলামকে উঠিয়ে
নিয়ে যায়। চোখের সামনে
ছেলেকে জোর করে ডিবির
গাড়িতে তুলতে দেখেছিলেন তিনি।
এরপরে র্যা ব, পুলিশ, ডিবি সবার কাছে
গেছেন, কেউ কিছু বলেনি। তিনি
বলেন, ‘এখন প্রধানমন্ত্রীর কাছে
অনুরোধ, আমার ছেলেকে কোথায়
মাটিতে পুঁতে রাখা হয়েছে তা বলে
দিক। আমি ছেলের মাটি নিয়ে শেষ
দিন পর্যন্ত বেঁচে থাকব।’
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর
পরিচয় দিয়ে বাসা থেকে ধরে নিয়ে
যাওয়া সূত্রাপুর থানা ছাত্রদলের
সভাপতি সেলিম রেজা ওরফে পিন্টুর
বোন রেহেনা বানু বলেন, ‘তখন ওর
গায়ে প্রচণ্ড জ্বর, শীতের রাত। এ সময়
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর
সদস্যরা বাসায় ঢুকে বিছানা থেকে
তাকে টেনেহিঁচড়ে তোলে। জামাও
পরতে দেয়নি। তারা বলেছিল, ডিবি
অফিসে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
জিজ্ঞাসাবাদ করেই ছেড়ে দেওয়া
হবে। কিন্তু এরপর কোথাও কোনো খোঁজ
মিলল না। তার অপেক্ষায় আমাদের
চোখের পানি শুকিয়ে গেছে।’
সংবাদ সম্মেলনে সমাপনী বক্তব্য দেন
সাজেদুল ইসলামের মা হাজেরা
খাতুন। তবে কান্নায় বেশি কিছু বলতে
পারেননি তিনি। কাঁদতে কাঁদতে
বললেন, ‘আমরা এখনো আশায় আছি।
প্রধানমন্ত্রী যেন আমাদের বাচ্চাদের
ফিরিয়ে দেওয়ার হুকুম দেন।’
সংবাদ সম্মেলনে আইন ও সালিশ
কেন্দ্রের পরিচালক নূর খান লিটন ও
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আসিফ
নজরুল উপস্থিত ছিলেন। পরে আসিফ
নজরুল সাংবাদিকদের বলেন, অপরাধ
করে পার পেয়ে যাবেন, এ রকম ভাবার
কোনো কারণ নেই। কোনো না
কোনো দিন বিচারের মুখোমুখি
হতে হবে।
স্বজনেরা জানান, ২০১৩ সালের ৪
ডিসেম্বর রাজধানীর বসুন্ধরা
আবাসিক এলাকা ও শাহীনবাগ থেকে
আটজনকে র্যা ব-১ লেখা গাড়িতে
করে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়। তাঁরা
হলেন সাজেদুল ইসলাম, সাজেদুলের
খালাতো ভাই জাহিদুল করিম
(তানভীর), পূর্ব নাখালপাড়ার আবদুল
কাদের ভূঁইয়া (মাসুম), পশ্চিম
নাখালপাড়ার মাজহারুল ইসলাম
(রাসেল), মুগদাপাড়ার আসাদুজ্জামান
(রানা), উত্তর বাড্ডার আল আমিন, এ এম
আদনান চৌধুরী ও কাওসার আহমেদ। এর
আগে ২০১৩ সালে ২৮ নভেম্বর খালিদ
হাসান (সোহেল) ও সম্রাট মোল্লা
নামে দুজনকে কেন্দ্রীয় কারাগারের
ফটক থেকে; ২ ডিসেম্বর জহিরুল ইসলাম
(হাবিবুর বাশার জহির), পারভেজ
হোসেন, মো. সোহেল ও মো.
সোহেলকে (চঞ্চল) শাহবাগ থেকে; ৬
ডিসেম্বর নিজাম উদ্দিন (মুন্না) ও
তরিকুল ইসলাম (ঝন্টু) দক্ষিণখানের
মোল্লারটেক থেকে; ৭ ডিসেম্বর
মাহবুব হাসান ও কাজি ফরহাদ সবুজবাগ
থেকে এবং ১১ ডিসেম্বর মিরপুরের
পল্লবী থেকে সেলিম রেজাকে
(পিন্টু) ধরে নিয়ে যাওয়া হয়।
News Desk
শেয়ার করুন